স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে মোট পঁচিশ জন ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পঁচিশ জনের মধ্যে দুজন পরবর্তীতে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেছেন, আর দুজন হয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তবে অন্তত দুজনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই পদত্যাগ করেছেন, কারও ক্ষেত্রে যা অনেকটা বাধ্য হয়েই।
এই পঁচিশ জনের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন এগারো জন, আর ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন চৌদ্দ জন। জীবিত এগারো জনের মধ্যে দশ জন দেশেই বসবাস করছেন, একজন থাকেন কানাডায়।
আইনজীবী মহল ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ বলছে, অবসর-পরবর্তী জীবনে এই বিচারপতিদের প্রত্যেকের পথ ভিন্ন ভিন্ন। কেউ বই পড়া আর লেখালেখিতে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ যুক্ত আছেন আর্বিট্রেশন বা সালিস কার্যক্রমে, আবার কারও দিন কাটছে অনেকটাই নিভৃতে, লোকচক্ষুর আড়ালে। এমনকি একজনকে অবসর জীবনে মামলার মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারেও থাকতে হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ছাব্বিশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একজন বিচারপতি, যিনি গত ডিসেম্বরের শেষদিকে এই পদে শপথ নিয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা সাতষট্টি বছর নির্ধারিত থাকায় তার দায়িত্বকাল চলবে আরও প্রায় দুই বছর।
তার ঠিক আগে, দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পঁচিশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের এক বিচারপতি। বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় গত ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। বর্তমানে তার দিন কাটছে বই পড়া আর লেখালেখির মধ্য দিয়ে— দীর্ঘদিন আইন-সংক্রান্ত বইয়ের বাইরের বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ায় জমে থাকা বইগুলো এখন মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
চব্বিশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দুই হাজার তেইশ সালের সেপ্টেম্বরে শপথ নেওয়া একজন বিচারপতির মেয়াদ শেষ হয় নাটকীয়ভাবে। সুপ্রিম কোর্টের একটি সভা নিয়ে ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়কের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, এরপর সেই সভা স্থগিত হয়ে যাওয়া এবং আদালত প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের দিনভর বিক্ষোভের মুখে দুই হাজার চব্বিশ সালের আগস্টে তিনি ও আপিল বিভাগের আরও পাঁচ বিচারপতি একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় বছর আগেই তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তেইশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দুই হাজার একুশ সালের শেষ দিনে শপথ নেওয়া একজন বিচারপতি দুই বছর পর অবসরে যান। বর্তমানে তিনি রায় লেখার পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনা ও লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে জানিয়েছেন।
বাইশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দুই হাজার আঠারো সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া একজন বিচারপতি প্রায় চার বছর এই পদে থেকে দুই হাজার একুশের শেষ দিকে অবসরে যান। বর্তমানে তিনি মাঝেমধ্যে আর্বিট্রেশন বা সালিস কার্যক্রমে যুক্ত থেকে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বলে জানান।
একুশতম প্রধান বিচারপতির অবসর-পরবর্তী জীবন অবশ্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত। দুই হাজার পনেরো সালের জানুয়ারিতে শপথ নেওয়া এই বিচারপতি ছিলেন দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো অমুসলিম ব্যক্তি, যিনি এই সর্বোচ্চ বিচারিক পদে বসেছিলেন। তার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল দুই হাজার আঠারো সালের জানুয়ারিতে, কিন্তু মেয়াদ শেষের প্রায় তিন মাস আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়েই তিনি নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন, তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে তার লেখা একটি রায় নিয়ে। এরপর দুই হাজার সতেরো সালের অক্টোবরে ছুটিতে যাওয়া, পরে সেই ছুটি বাড়িয়ে বিদেশ গমন এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশ থেকেই পদত্যাগপত্র পাঠানো— এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ওই বছরের নভেম্বরে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
বর্তমানে কানাডার একটি শহরে বসবাসরত এই সাবেক প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, দেশে ফিরতে চাইলেও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ-সংক্রান্ত কাগজপত্র না পাওয়ায় তিনি আটকে আছেন। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেও বছর দুয়েকের বেশি সময় ধরে কোনো সাড়া পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান। এমনকি পেনশনের জন্য জমা দেওয়া কাগজপত্রও এখনো অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আর্থিকভাবে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি মানসিক চাপেও আছেন বলে জানান এই সাবেক প্রধান বিচারপতি। তার দাবি, তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত এক মামলায় দুই হাজার একুশ সালের নভেম্বরে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাকে দুটি ধারায় যথাক্রমে সাত ও চার বছরের কারাদণ্ড দেয়।
বিশতম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দুই হাজার এগারো সালের মে মাসে শপথ নেওয়া একজন বিচারপতি প্রায় সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর দুই হাজার পনেরো সালের জানুয়ারিতে অবসরে যান।
ঊনিশতম প্রধান বিচারপতির অবসর-পরবর্তী জীবন ছিল সবচেয়ে ঘটনাবহুল। দুই হাজার দশ সালের সেপ্টেম্বরে শপথ নিয়ে পরের বছরের মে মাসে অবসরে যাওয়া এই বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনকারী সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দিয়েছিল, তা নিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ বিতর্ক চলে।
দুই হাজার পঁচিশ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে ঘটা এক হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, পরবর্তীতে আরও একাধিক মামলায় তাকে জড়ানো হয়— সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় নয়টি। এক বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর চলতি বছরের আগস্টে জামিনে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন তিনি।
অন্যান্য সাবেক প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে সতেরোতম প্রধান বিচারপতি মাত্র সাতচল্লিশ দিনের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন দুই হাজার নয় থেকে দুই হাজার দশ সালের মধ্যে। বর্তমানে রাজধানীর বনানীর বাসায় থেকে বার্ধক্যজনিত শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হয় বলে জানান। তবে বয়স বিবেচনায় নিজেকে মোটামুটি সুস্থ বলেই মনে করেন তিনি, পাশাপাশি মাঝেমধ্যে সালিস কার্যক্রমেও যুক্ত থাকেন এবং পুরোনো সহপাঠীদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
চৌদ্দতম প্রধান বিচারপতি, যিনি দুই হাজার চার থেকে দুই হাজার সাত সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন, বর্তমানে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এবং মাঝেমধ্যে বাইরে বের হন বলে জানান।
তেরোতম প্রধান বিচারপতি, যিনি দুই হাজার তিন থেকে দুই হাজার চার সাল পর্যন্ত অল্প সময়ের জন্য এই দায়িত্বে ছিলেন, বর্তমানে পায়ের সমস্যা নিয়ে কিছুটা কষ্টে থাকলেও মোটের ওপর ভালো আছেন এবং বই পড়ে অবসর সময় কাটান বলে জানান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার অবসর গ্রহণের পরপরই দুই হাজার চার সালে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা পঁয়ষট্টি থেকে বাড়িয়ে সাতষট্টি বছর করা হয়েছিল।
অষ্টম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা একজন বিচারপতি বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ কষ্টে আছেন বলে জানান। রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় থেকে তিনি ভালোভাবে কথা বলতেও পারেন না বলে জানিয়েছেন, তবে সবার মঙ্গল কামনা করেন বলে মন্তব্য করেন।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা পঁচিশ জন প্রধান বিচারপতির মধ্যে চৌদ্দ জনই ইতিমধ্যে মারা গেছেন। এদের মধ্যে প্রথম থেকে সপ্তম প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত সবাই প্রয়াত হয়েছেন, যাদের মেয়াদকাল বিস্তৃত ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দেড় দশক জুড়ে। এরপর নবম থেকে দ্বাদশ প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত চারজনও প্রয়াত হয়েছেন, যাদের দায়িত্বকাল ছিল নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে দুই হাজার তিন সাল পর্যন্ত। এছাড়া পনেরো, ষোলো ও আঠারোতম প্রধান বিচারপতিও ইতিমধ্যে মারা গেছেন।
এই দীর্ঘ তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, যারা পরবর্তীতে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের টালমাটাল সময়ে তৎকালীন এক প্রধান বিচারপতি দেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন, যদিও পরের বছরই তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৯৭ সালে তার মৃত্যু হয়।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনের পর তৎকালীন এক প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা করেন। পরে নির্বাচনের পর তিনি আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফেরেন, আর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি এই পদ থেকে অবসর নেন এবং ২০২২ সালে মারা যান।
আরেকজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ১৯৯৫ সালে অবসর নেওয়ার পর ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং সেই বছরই একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার তত্ত্বাবধানে। ২০১৪ সালে তিনি মারা যান।
একইভাবে দুই হাজার এক সালে দায়িত্ব শেষ করা আরেকজন প্রধান বিচারপতিও সেই বছরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তার মৃত্যু হয়।
সব মিলিয়ে দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া এই ব্যক্তিদের অবসর-পরবর্তী জীবনের এই বৈচিত্র্যময় চিত্র একদিকে যেমন ব্যক্তিগত পছন্দ ও পরিস্থিতির ভিন্নতা তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের নানা টানাপোড়েনও প্রতিফলিত করে। বিচার বিভাগের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের অবসর-পরবর্তী অভিজ্ঞতা— তা লেখালেখি হোক, সালিস কার্যক্রম হোক, নাকি আইনি জটিলতা— একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ততার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

