ব্যক্তিগত জিম্মায় দেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শর্ত ভঙ্গ করে নির্যাতন ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় দুটি হাতিকে আবার নিজেদের হেফাজতে নিয়ে এসেছে বন বিভাগ। মাদি হাতি ‘নিহার কলি’ এবং পুরুষ হাতি ‘সম্রাট বাহাদুর’ নামের এই দুটি প্রাণীকে বর্তমানে রাখা হয়েছে গাজীপুর সাফারি পার্কে, যেখানে তারা রয়েছে নিবিড় পর্যবেক্ষণে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশে গত সোমবার (২৪ আগস্ট) একটি অভিযান পরিচালনা করে হাতি দুটিকে উদ্ধার করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, গত ১২ আগস্ট গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকেই নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে হাতি দুটিকে দুই ব্যক্তির জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু হস্তান্তরের পর থেকেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে সেই শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি নজরে আসার পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে হাতি দুটির সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নির্দেশনা দেওয়ার সময় মন্ত্রী নিজে দেশের বাইরে মঙ্গোলিয়ায় একটি জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিচ্ছিলেন, তবে সেখান থেকেই তিনি পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। তার নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট— বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা ও কল্যাণের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, আর শর্ত ভঙ্গ হলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই দুটি হাতির অতীত ইতিহাসও বেশ ঘটনাবহুল। প্রায় দুই বছর আগে এই হাতি দুটিকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায়সহ নানা অভিযোগ ওঠায় তখনই একবার সেগুলো উদ্ধার করে সাফারি পার্কে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরবর্তীতে হাতি দিয়ে আর চাঁদাবাজি না করার প্রতিশ্রুতিসহ কয়েকটি শর্তে আগের মালিকরা আবার সেগুলো নিজেদের জিম্মায় নিয়েছিলেন।
বন বিভাগ কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, পুরুষ হাতি ‘সম্রাট বাহাদুর’কে উদ্ধার করা হয় মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার একটি সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে, যেখানে হাতিটিকে দিয়ে বনের ভেতর থেকে ভারী গাছ টেনে আনার মতো কষ্টসাধ্য কাজ করানো হচ্ছিল। স্থানীয় এক রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারের সময় হাতিটি অত্যন্ত ক্লান্ত ও পানিশূন্য অবস্থায় ছিল— প্রায় সাত-আট কিলোমিটার পথ হেঁটে আসার কারণে সেটি একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছিল। এছাড়া হাতিটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের সময় নির্দেশ না মানলে মাহুতরা ধারালো লোহার সরঞ্জাম দিয়ে হাতিটিকে আঘাত করতেন। যদিও হাতিটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাহুত দাবি করেছেন, জঙ্গলে চলাফেরার সময় কাঁটাযুক্ত গাছের সংস্পর্শে এসেই এসব ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তার এই ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে মাদি হাতি ‘নিহার কলি’কে উদ্ধার করা হয় মৌলভীবাজারেরই কমলগঞ্জ উপজেলার আরেকটি সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে।
গাজীপুর সাফারি পার্কের একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, সোমবার দুপুরে পাঁচ সদস্যের একটি দল সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়। দীর্ঘ যাত্রা শেষে উদ্ধার হওয়া হাতি দুটির একটি মঙ্গলবার ভোররাতে এবং অন্যটি সকালের দিকে সাফারি পার্কে এসে পৌঁছায়। যাত্রা শেষে ক্লান্ত হাতি দুটিকে বর্তমানে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা শেডে রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরও জানান, পার্কে পৌঁছানোর পরপরই হাতি দুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রেখে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও খাদ্য নিশ্চিত করা হবে।
প্রধান বন সংরক্ষক জানান, মন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুততার সঙ্গেই এই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। এক বিবৃতিতে পরিবেশমন্ত্রী নিজেও স্পষ্ট করে বলেন, বন্যপ্রাণীর কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর জিম্মায় নেওয়া কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের একটি বড় অংশ এই উদ্ধার তৎপরতাকে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত জিম্মায় থাকা হাতি বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অপব্যবহার ঠেকাতে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং জিম্মা প্রদানের ক্ষেত্রে আরও কঠোর তদারকির পথ তৈরি করবে।

