পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে পাল্টাপ্রশ্ন করার ঘটনাকে সাবেক কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের একটি পুরোনো প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটির ভাষায়, এটি মূলত বার্তাবাহককে আক্রমণ করার একটি চর্চা, যা প্রশ্নের প্রকৃত জবাব এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই মন্তব্য করেছে।
টিআইবি বলছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সাংবিধানিকভাবে বৈধ কি না, এই বিষয়ে স্বচ্ছভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরা উচিত ছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর। কিন্তু সাংবাদিকরা এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে উল্টো পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন বলে অভিযোগ সংস্থাটির।
সংস্থাটির মূল্যায়ন হলো, জনস্বার্থে তথ্য জানতে চাওয়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাদের প্রতি বিরক্তি বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের জন্য একটি স্পষ্ট হুমকি।
বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কাউকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই তাদের মূল্যায়ন। তিনি সংবিধানের নির্দিষ্ট দুটি অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দেন— একটি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন এমন কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হলে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। আবার আরেকটি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন।
এই দুই বিধান একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে মনে করে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এই বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করেই পদ গ্রহণ করায় প্রতিমন্ত্রী নিজেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, সাংবাদিকরা যখন এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী সরাসরি জবাব না দিয়ে বরং কে এই সংবাদ তৈরি করছে বা কার এত আগ্রহ— এই ধরনের পাল্টাপ্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তার মতে, এটি সাবেক কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে প্রচলিত বার্তাবাহককে আক্রমণ করার সেই পুরোনো চর্চারই প্রতিফলন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কে এই সংবাদ তৈরি করেছেন বা কে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটি এখানে মুখ্য বিষয় নয়। মূল প্রশ্নটি হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। এমন একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেওয়াটাই তার দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নকে হুমকি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই মাসের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সুশাসনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি জবাব প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকদের প্রতি বিরক্তি বা বিদ্বেষমূলক পাল্টাপ্রশ্ন করাটা একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় আচরণ নয়।
সংস্থাটির মূল্যায়ন হলো, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া শুধু সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওপর অহেতুক চাপ তৈরি করে না, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এর ফলে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করার একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদকে কেন্দ্র করে দ্বৈত নাগরিকত্বের এই বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রভাবও থাকতে পারে বলে মনে করছে টিআইবি। তাই সরকারের প্রতি অবিলম্বে প্রতিমন্ত্রীর প্রকৃত নাগরিকত্ব অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। এর পাশাপাশি সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে যদি প্রশ্ন থেকে থাকে, তাহলে স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহিতার স্বার্থে তাদের ক্ষেত্রেও নিজ নিজ অবস্থান ও প্রামাণ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

