দেশের বেকার যুবসমাজকে বিদেশের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশাল এক প্রশিক্ষণ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। কোরিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজার লক্ষ্য করে পঞ্চাশ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণীকে দক্ষ কেয়ারগিভার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় আটশ চৌত্রিশ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছর থেকে ২০৩১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত প্রায় দুই হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে জাপানি ভাষাসহ বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগী বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বাকিদের ক্ষেত্রেও তারা যে দেশে যেতে আগ্রহী, সেই অনুযায়ী ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্মহীন তরুণ-তরুণীদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করে দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারে সংযুক্ত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে নারীদের জন্য কেয়ারগিভিং খাতকে সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অন্তত ষাট শতাংশকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বিভাগের একজন পরিচালক বলেন, এই ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের জন্য একেবারেই নতুন উদ্যোগ, কারণ আগে এমন চাহিদা তেমন ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে দেশে-বিদেশে কেয়ারগিভারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তিন মাসের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে রোগীর প্রাথমিক সেবা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও দৈনন্দিন সহায়তার মতো বিষয় শেখানো হবে। ন্যূনতম এসএসসি পাস হলেই এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যত্নসেবা খাতে প্রায় সত্তর লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে, আর বিশ্বব্যাপী এই খাতে চাহিদা তিরিশ কোটির বেশি হতে পারে। বিশ্বজুড়ে বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেয়ারগিভিং পেশার চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে, বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপে। তবে ভাষাগত দক্ষতা ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের অনেক তরুণ এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না।
একজন প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারের কাজের পরিধিতে থাকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত পরিচর্যা, খাবার প্রস্তুত এবং চলাচলে সহায়তার মতো বিষয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই কাজের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই সাধারণ পরিচর্যা ও সহায়ক সেবা, আর মাত্র পাঁচ শতাংশ সরাসরি চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট। এ কারণে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব, যা স্বাস্থ্যখাতের জনবল সংকট কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
একটি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা ডেটাবেসে প্রকাশিত এক গবেষণার বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে, ফলে শহরাঞ্চলে অনেক প্রবীণ মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এ প্রেক্ষাপটে প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রতি ছয়জনের একজনের বয়স ষাট বছরের বেশি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি যত্নের চাহিদা আরও বাড়াবে। বিশ্বব্যাপী এই খাতের বাজার আকারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের মহানগরীগুলোতে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে যুব বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি, আর উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্প আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ তথ্য বলছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় নয় লাখ ছাড়িয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে লক্ষাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ছাব্বিশ থেকে সাতাশ লাখের মধ্যে, যা শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর মনে করছে, কেয়ারগিভিংয়ের মতো স্বল্পমেয়াদি ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনতাত্ত্বিক সুবিধা কমতে শুরু করবে, তাই এই সময়ের মধ্যে যুবশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা না গেলে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে আবেদন সংগ্রহ করে বাছাই পরীক্ষার ভিত্তিতে আঠারো থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী, ন্যূনতম এসএসসি পাস প্রার্থীদের নির্বাচন করা হবে। মহানগর ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে পৃথক নির্বাচন কমিটি গঠন করে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
দেশের তেরোটি মহানগরীর পাঁচশ একটি ওয়ার্ডে তেত্রিশটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে মোট দুই হাজার চারটি ব্যাচের মাধ্যমে পঞ্চাশ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণীকে কেয়ারগিভিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যেখানে প্রতিটি ব্যাচে অংশ নেবেন পঁচিশজন প্রশিক্ষণার্থী। প্রতিটি ব্যাচ শেষে থাকবে মেন্টরশিপ কার্যক্রম এবং বিনা মূল্যে অনলাইন পরামর্শ সেবা, পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।

