বাংলাদেশ আজ এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।প্রতিদিনই সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়ে সহিংসতা, হত্যা, নিখোঁজ, ধর্ষণ, শিশু বলাৎকার, চাঁদাবাজি, হামলা, হাম-ডেঙ্গুতে মৃত্যু কিংবা সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের ওপর আক্রমণের খবর। ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন মনে হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি অভিন্ন সংকট; মানুষের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের কার্যকর সুরক্ষার প্রশ্ন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকের প্রথম প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। সে নিরাপদে বাঁচতে চায়। সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে চায়। কর্মস্থল থেকে নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়। নিজের শরীর, সম্পদ, মতামত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে আতঙ্কে থাকতে চায় না। কিন্তু যখন হত্যা ও হামলার খবর নিয়মিত হয়ে ওঠে, যখন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে, যখন চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে তখন নাগরিকের মনে অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো আসলে কার জন্য এবং কতটা কার্যকর?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা যেন ধীরে ধীরে ভয়াবহতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে, কিছুদিন আলোচনা হয়, বিচার ও শাস্তির দাবি ওঠে তারপর নতুন আরেকটি ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পেছনে থেকে যায় একটি ভেঙে পড়া পরিবার, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত আস্থার দীর্ঘ ছায়া।
নিখোঁজের ঘটনা এই সংকটকে আরও নির্মম করে তোলে। একজন মানুষ নিখোঁজ হলে শুধু একজন ব্যক্তি হারিয়ে যান না; তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। মা-বাবা, সন্তান, স্বজন-সবাই অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের, একটি খোঁজের, একটি উত্তরের জন্য। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু তদন্ত শুরু করা নয়; দায়িত্ব হলো নাগরিককে বিশ্বাস করানো যে কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করার জন্য রাষ্ট্র সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে কাজ করবে।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা আরও গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষী সুরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের কঠোর প্রয়োগ। বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীর চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে ভয় ও নীরবতা।
অন্যদিকে হাম- ডেঙ্গু আমাদের সামনে জনস্বাস্থ্যের আরেকটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। একটি প্রতিরোধযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে শিশুসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; এটি টিকা ও নগর ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির প্রশ্নও। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংকটের সময় শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই হবে না, রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই সময়মত টিকাদান সহ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে সংস্কৃতি ও মুক্ত প্রকাশের ওপর বিভিন্ন ধরনের হামলা ও বাধা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজেদের ধর্মীয় আবেগ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পচর্চা বা মতপ্রকাশের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেটি শুধু একটি নির্দিষ্ট আয়োজনের ওপর আঘাত নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপরও প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশের সমাজ বহু মত, বহু বিশ্বাস ও বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সংস্কৃতি চর্চা ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অধিকারও নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কোনো পক্ষের আবেগ, ক্ষোভ বা মতভেদ কখনোই সহিংসতার লাইসেন্স হতে পারে না। আপত্তি থাকলে তার সমাধান আইন, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হতে হবে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই – আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর?
অপরাধী যদি প্রভাবশালী হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেরি হয় কেন? কোনো গোষ্ঠী যদি জনতার নামে হামলা চালায়, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করে? ধর্ষণ, হত্যা বা চাঁদাবাজির ঘটনায় বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লাগলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?
একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল কঠোর আইন প্রণয়নে নয়; সেই আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করার সক্ষমতায়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু গ্রেপ্তারের খবর দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। তদন্তের মান, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এ সবকিছু মিলিয়েই একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয়।
নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়
বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলে সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে। এখানে পরিবার, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্কৃতির সম্মিলিত সংকট রয়েছে। সমাজ যখন সহিংসতাকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে শুরু করে, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে অপরাধকে আড়াল করে, তখন অপরাধীরাই সাহসী হয়ে ওঠে।
তাই প্রয়োজন শূন্য সহনশীলতার নীতি তবে সেটি যেন নির্বাচিতভাবে নয়, সর্বজনীনভাবে প্রয়োগ করা হয়। হত্যা করলে অপরাধী, ধর্ষণ করলে অপরাধী, চাঁদাবাজি করলে অপরাধী, হামলা করলে অপরাধী-তার পরিচয়, দল, মত বা গোষ্ঠী যাই হোক না কেন।
মানুষের জীবনের মূল্য ফিরিয়ে আনতে হবে
আজ আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মানুষের জীবনের মূল্যকে আবার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। নিহত মানুষটি কোনো পরিসংখ্যান নয়। নিখোঁজ মানুষটি কোনো মামলার নম্বর নয়। ধর্ষণের শিকার শিশুটি কোনো শিরোনাম নয়। হামে মৃত শিশুটি কোনো দৈনিক মৃত্যুসংখ্যা নয়। আর সংস্কৃতির ওপর হামলাও কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এসবের প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের সামনে এখন উন্নয়ন, রাজনীতি ও ক্ষমতার আলোচনার পাশাপাশি আরও মৌলিক একটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে মানুষ কি নিরাপদ
কারণ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সাধারণ নাগরিক রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, সকালে নিরাপদে বের হতে পারেন এবং বিশ্বাস করতে পারেন বিপদে পড়লে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে।
শেষ ও প্রধান কথা: রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব মানুষকে নিরাপদ রাখা
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের ভয় দূর করা যায় না। নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে হত্যা, ধর্ষণ, নিখোঁজ, চাঁদাবাজি ও হামলার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। হাম-ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকটে প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাউল শিল্পী,সাংস্কৃতিক কর্মী ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর হামলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে আইনের কঠোর ও সুষম প্রয়োগের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব ক্ষমতাবানকে রক্ষা করা নয়, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখা।
যেদিন বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষ সত্যিকার অর্থে বলতে পারবেন
“আমি নিরাপদ, আমার সন্তান নিরাপদ, আমার অধিকার নিরাপদ”
সেদিনই আমরা একটি শক্তিশালী, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র বিনির্মান করছি কথাটি বলতে পারব।

