দেশে মাদকাসক্ত নারী ও কিশোর-কিশোরীর চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়লেও সরকারি পুনর্বাসন ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পুরুষকেন্দ্রিক। সীমিত শয্যা, দীর্ঘ অপেক্ষা, জনবল সংকট এবং চিকিৎসার পর পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়ার উচ্চ হার—সব মিলিয়ে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে মাত্র ১৯৯টি শয্যা রয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে শয্যা রয়েছে ৬ হাজার ১৯০টি। দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ মাদকনির্ভরতায় ভুগছেন বিবেচনায় এই সক্ষমতাকে অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র দেশের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। অতীতে সেখানে মোট ১২৪টি শয্যার মধ্যে পুরুষদের জন্য ছিল ৯০টি, নারীদের জন্য ২৪টি এবং শিশুদের জন্য মাত্র ১০টি। বর্তমানে কেন্দ্রটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ চলছে। তবে অবকাঠামোগত কাজ চলায় আপাতত সেখানে মাত্র ২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শুধু নারী ও কিশোরদের ক্ষেত্রেই নয়, সরকারি কেন্দ্রে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্যও ভর্তি হওয়া সহজ নয়। তেজগাঁও কেন্দ্রের বাইরে ৬৫ বছর বয়সী এক নারী তার ৩৫ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের জানানো হয়েছিল, ছেলেকে ভর্তি হতে দুই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। ওই যুবক বলেন, সুযোগ পেলে তিনি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরতে চান।
সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যাও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিএনসির তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় নগণ্য। এরপর ২০১৬ সালে ৯০ জন, ২০১৮ সালে ১৭১ জন, ২০১৯ সালে ৫৪৪ জন এবং ২০২০ সালে ১ হাজার ২৪২ জন নারী ও শিশু সরকারি চিকিৎসাসেবা নেয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে অবশ্য সংখ্যাটি ওঠানামা করেছে। ২০২৩ সালে ৯১৭ জন, ২০২৪ সালে ৭০৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৩৪ জন নারী ও শিশু সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে এই কমে যাওয়াকে চাহিদা কমার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে মোট চিকিৎসাগ্রহণকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ১৩ হাজার ২৪ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭ হাজার ১৫৯ জনে।
২০২৫ সালে চিকিৎসা নেওয়া ৪৩৪ নারী ও শিশুর মধ্যে মাত্র ১২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা পেয়েছেন। একই সময়ে পুরুষ রোগীর ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৫৫ জন। অর্থাৎ নারী ও শিশুদের জন্য আবাসিক বা ইনপেশেন্ট চিকিৎসার সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদক ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ফলে কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্তির ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মনোবিজ্ঞানী মো. আরিফুল হকের মতে, বন্ধু বা সহপাঠীদের চাপ, কৌতূহল, মানসিক চাপ, পারিবারিক সংকট এবং অভিভাবকের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব কিশোরদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
তেজগাঁও কেন্দ্রের প্রধান পরামর্শক ডা. কাজী লুৎফুল কবীর জানান, ১৮টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে সেখানে চিকিৎসক আছেন মাত্র চারজন। নার্সসহ অন্যান্য কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি এই কেন্দ্রে রোগীদের বিনামূল্যে খাবার ও ওষুধ দেওয়া হয় এবং সাধারণত ২৮ দিনের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর এক বছর পর্যন্ত ফলোআপের ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসার খরচ প্রতিষ্ঠান ও সেবার ধরন অনুযায়ী মাসে কয়েক হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২০২৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩৯ হাজার ৬৪১ জন মাদকনির্ভর মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৭৬ জন। তবে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৩ হাজার ২৪ জন থেকে কমে ৭ হাজার ১৫৯ জন হয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫২ থেকে বেড়ে ৩২ হাজার ৪৮২ জন হয়েছে।
ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশে পুনর্বাসনসেবা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অঞ্চলভেদে এর সুযোগে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে এই সংকট আরও প্রকট।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকার বাইরে দেশের সাত বিভাগে প্রতিটিতে ২০০ শয্যার একটি করে চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ডিএনসি। এর মাধ্যমে নতুন করে ১ হাজার ৪০০ শয্যা যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রের শয্যা সংকটে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অনেকের মাদকাসক্তির পেছনে থাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, নির্যাতন, রাস্তায় বসবাস, পাচার এবং নানা ধরনের সামাজিক ঝুঁকি।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আপন অ্যাডিকশন রিহ্যাবিলিটেশন রেসিডেন্সে থাকা ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর গল্প সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। একসময় রাস্তায় থাকা ওই কিশোরী বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি বুটিকের কাজ শিখছে। প্রায় চার বছর ধরে সে এই কেন্দ্রে রয়েছে এবং পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেছে। এখন তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করানোর চেষ্টা চলছে।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাকে ভারতে পাচার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফেরত আনা হলেও সে তার মা ও বোনকে খুঁজে পায়নি। পরে ঢাকার রাস্তায় থাকার সময় ড্যান্ডি ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়।
আপনের প্রশিক্ষক, কাউন্সেলর ও উন্নয়নকর্মী খন্দকার আশাদুজ্জামান জুয়েল জানান, সিংগাইর কেন্দ্রটিতে বর্তমানে ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২৫ শিশুকে এবং ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১২ কিশোরীকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন দেওয়া হচ্ছে। এসব শিশুর বেশিরভাগই ড্যান্ডি বা আঠা শোঁকার নেশায় আসক্ত। কেউ কেউ গাঁজা ও ইয়াবাতেও আসক্ত।
কেন্দ্রটিতে শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি পড়াশোনা, কাউন্সেলিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের সন্ধান করে পুনরায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাধারণত পুনর্বাসন কার্যক্রম এক বছর ধরে চলে, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সময় বাড়ানো হয়। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০-এর বেশি শিশু ও নারী এই কেন্দ্রের সেবা পেয়েছেন বলে জানান জুয়েল।
মাদকাসক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রোগ হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ জোরদারের সুপারিশ করেছে ডিএনসি। কারণ চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর একই পরিবেশে ফিরে গিয়ে অনেকেই আবার মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন।
ডা. লুৎফুল কবীরের হিসাব অনুযায়ী, চিকিৎসার পর প্রায় ৩৫ শতাংশ রোগী মাদক থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হন। কিন্তু প্রায় ৬৫ শতাংশ রোগী আগের পরিবেশ বা একই ধরনের বন্ধুমহলে ফিরে গিয়ে আবার মাদক গ্রহণ শুরু করেন।
ফলে শুধু নতুন পুনর্বাসনকেন্দ্র বা শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। নারী ও কিশোরদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ চিকিৎসা সুবিধা, পর্যাপ্ত জনবল, দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে মাদকাসক্তির এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে থাকবে।

