জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, আয় বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদ আবাসনের সমস্যা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। শুধু গৃহহীন মানুষের সংখ্যাই নয়, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থানের অভাবও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ আবাসন বলতে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই বোঝায় না। একটি বাসস্থানের কাছাকাছি বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থাকা জরুরি। এই বিবেচনায় দেশের কয়েক কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ আবাসনের সুবিধার বাইরে রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এ সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে এ বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সোমবার ৫ অক্টোবর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোতে আবাসনের বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান ঘাটতি পূরণ এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নতুন ঘর নির্মাণ প্রয়োজন হবে।
দেশের সর্বশেষ জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, দেশে গৃহহীন বা পথবাসী মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন। মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুব বেশি না হলেও বাস্তব সংকট আরও বড়। কারণ বিপুলসংখ্যক মানুষ এমন আবাসনে বসবাস করছেন, যা নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর বা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের উপযোগী নয়।
জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ ৭ হাজার ৪৮৬টি বস্তি পরিবার রয়েছে, যেখানে বসবাস করেন প্রায় ১৮ লাখ মানুষ। এর মধ্যে শুধু ঢাকা জেলাতেই রয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ২৬৮টি বস্তি পরিবার এবং এসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার ৬২৮ জন।
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে আবাসন সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট। সীমিত জমি, বাড়তি ভাড়া, জমির উচ্চমূল্য এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে অনেক মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ঢাকার মতো বড় শহরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক মানুষের জন্য নিজস্ব বাড়ি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন ভাড়ার বাসায় থাকতে হতে পারে। কারণ সাশ্রয়ী আবাসন ঋণের সুযোগও এখনো সীমিত।
আবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ আবাসন শুধু একটি ঘরের বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। অনিরাপদ ও অপরিকল্পিত আবাসনে বসবাস করলে মানুষ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকেও পিছিয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আবাসন সংকটও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৩৪০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অনিরাপদ বা অপর্যাপ্ত আবাসনে বসবাস করছে। এর মধ্যে ১০০ কোটির বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বস্তিতে বসবাস করে এবং ৩০ কোটির বেশি মানুষ গৃহহীন।
বিশ্বব্যাপী আবাসন ঘাটতিও বাড়ছে। ২০১০ সালে যেখানে বৈশ্বিক আবাসন ঘাটতি ছিল প্রায় ২৫ কোটি ১০ লাখ ইউনিট, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিটে।
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর, বিশেষ করে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকামুখী প্রবণতা শহরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে একদিকে বাড়ছে ভাড়ার চাপ, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিত বসতি।
সরকার আবাসন সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ, আবাসিক প্লট উন্নয়ন এবং বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস পদ্ধতিতে আবাসিক প্লট উন্নয়নের কাজও চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী গৃহঋণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা, সরকারি জমির কার্যকর ব্যবহার এবং পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের আবাসন সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। জাতীয় আবাসন নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহর থেকে শুরু করে দেশের ছোট পৌরসভাগুলোতেও সমানভাবে নাগরিক সুবিধা ও সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন নগর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন দুটোই জরুরি। তা না হলে শহর বড় হবে, কিন্তু মানুষের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের সুযোগ নিশ্চিত হবে না।
আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ‘নেইবারহুড ইউনিট কনসেপ্ট’ অনুযায়ী একটি বাসস্থান থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পার্ক ও বাজারের মতো সুবিধা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শহর ও গ্রামীণ এলাকায় এই ধরনের সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শহর ও গ্রামের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছে। তাই আবাসনকে শুধু নির্মাণ খাত হিসেবে না দেখে মানব উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দ্রুত বাড়তে থাকা নগর জনসংখ্যার জন্য এমন আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষ শুধু একটি ঘর নয়, বরং নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।

