বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তারা নাকি রাজপথের চেয়ে ক্যারিয়ার, ব্যক্তিজীবন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, প্রয়োজন ও বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা তৈরি হলে তরুণরা শুধু রাজনীতিতে অংশ নেয় না, তারা রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা তরুণ রা কি প্রচলিত রাজনীতিতে ফিরতে চায়, নাকি তারা রাজনীতির একটি নতুন ভাষা খুঁজছে?
বাংলাদেশের তরুণরা রাজনীতিবিমুখ নয়; বরঞ্চ তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি বিরক্ত ও অনাস্থাশীল। রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি, নৈতিকতার সংকট, ব্যক্তিপূজা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি তরুণদের বড় একটি অংশকে প্রচলিত দলীয় কাঠামো থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সামনে রয়েছে দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সেবা-খাতে হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলার মতো বাস্তব সমস্যা। অর্থাৎ তারা রাজনীতি থেকে পালাতে চায় না; তারা এমন রাজনীতি চায়, যা তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান করবে।
রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি অনাস্থা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ আর প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি বিরক্তি এক জিনিস নয়।
একজন তরুণ হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিলে যেতে আগ্রহী নয়। কিন্তু সে চাকরি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাজারের দ্রব্যমূল্য নিয়ে ক্ষুব্ধ। সরকারি অফিসে দুর্নীতি ও হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার। হাসপাতালে সেবা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তার আছে। পুলিশি সেবা পেতে পরিচিত মানুষের প্রয়োজন কেন সে প্রশ্নও তার আছে।
এসব প্রশ্নই রাজনীতির প্রশ্ন।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহু বছর ধরে রাজনীতিকে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সেখানে রাজনীতি মানেই প্রায়শই নেতার নামে স্লোগান, পোস্টারে মুখ, মিছিলের লোকসংখ্যা, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বক্তব্য এবং ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছে না।
তারা জানতে চায়—দেশ বদলানোর পরিকল্পনা কোথায়?
তরুণদের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়নের পথ
রাজনীতিবিদেরা প্রায়ই বলেন বেকারত্ব দূর করা হবে, দ্রব্যমূল্য কমানো হবে, দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন ভিন্ন।
কীভাবে?
এই একটি প্রশ্নই বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কেউ যদি বলে বেকারত্ব কমাবে, তাহলে তরুণরা জানতে চায় কোন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হবে? দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা কী? নতুন বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে?
কেউ যদি বলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে প্রশ্ন বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার পদ্ধতি কী? সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে হবে?
কেউ যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, তাহলে তরুণ প্রজন্ম আজ প্রশ্ন করে ক্ষমতায় গেলে নিজের দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও কি একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে?এই জায়গাতেই রাজনীতির পুরোনো ভাষা আর নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার মধ্যে সবচেয়ে বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
ব্যক্তিপূজার রাজনীতি বনাম জবাবদিহিতার রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি প্রায়শই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। নেতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যান, দল সমালোচনাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে এবং কর্মীদের কাছে রাজনৈতিক যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।
তারা নেতাকে দেবতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে চায় না। তারা প্রতিনিধিকে প্রশ্ন করতে চায়। প্রতিশ্রুতির হিসাব জানতে চায়। নির্বাচনের পরও জবাবদিহিতা দেখতে চায়।
অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের কাছে নেতৃত্বের ধারণা বদলাচ্ছে। নেতা আর সর্বজ্ঞ অভিভাবক নন; তিনি জনগণের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি।এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক দলগুলো যত দ্রুত বুঝবে, তাদের জন্য তত ভালো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু প্রচারণার মাঠ নয়
তরুণদের রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনও বদলে গেছে। পোস্টার, মাইকিং ও একমুখী বক্তৃতার যুগে বেড়ে ওঠা রাজনৈতিক কাঠামোর সামনে এখন পডকাস্ট, সরাসরি সাক্ষাৎকার, বিতর্ক, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং প্রশ্নোত্তরের নতুন সংস্কৃতি দাঁড়িয়েছে। নিবন্ধটিও দেখিয়েছে, তরুণরা শুধু নেতার উপস্থিতি নয়, তার বক্তব্য ও পরিকল্পনা যাচাই করতে চায়।
তবে এখানেও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কতা আছে। ডিজিটাল ক্যাম্পেইন মানেই আধুনিক রাজনীতি নয়।
নতুন লোগো, তরুণ মুখ বা ভাইরাল ভিডিও দিয়ে হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে সংগঠন, দক্ষতা, নীতি এবং বাস্তব কাজের ওপর। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া আর রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট:প্রতিশ্রুতির অভাব নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব
বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অভাব কখনো ছিল না। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির তালিকা সবসময়ই দীর্ঘ।
সমস্যা হলো প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান।
এই ব্যবধান থেকেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অবিশ্বাস। তরুণরা এখন শুধু নতুন কথা শুনতে চায় না; তারা পুরোনো প্রতিশ্রুতির হিসাবও চায়।
কতটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলো?
কত টাকা খরচ হলো?
কোন প্রকল্প ব্যর্থ হলো?
কেন ব্যর্থ হলো?
দায় কার?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হলে ‘নতুন রাজনীতি’ কেবল একটি নতুন স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।
তরুণদের সামনে রাজনীতির নতুন সংজ্ঞা
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি ক্রমেই একটি সমস্যা সমাধানের বিজ্ঞান হয়ে উঠছে।
তারা মতাদর্শকে পুরোপুরি অস্বীকার করছে না, কিন্তু মতাদর্শের চেয়ে জীবনের বাস্তব সংকটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে বাজারদর গুরুত্বপূর্ণ। বেকারের কাছে স্লোগানের চেয়ে কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়া মানুষের কাছে ক্ষমতার ভাষণের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ আর রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।
পরিশেষে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম হয়তো রাজনীতির বাইরে নেই, কিন্তু তারা রাজনীতির পুরোনো ঘরে ঢুকতে রাজি নয়।
তারা এমন রাজনীতি চায় যেখানে স্লোগানের সঙ্গে থাকবে পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে থাকবে সময়সীমা, ক্ষমতার সঙ্গে থাকবে জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্বের সঙ্গে থাকবে জনগণের কাছে হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
সবচেয়ে বড় কথা, তারা এমন রাজনীতি চায় যেখানে মানুষ শুধু ভোটার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন তাই মূল প্রশ্নটি হলো তরুণরা রাজনীতিতে আগ্রহী কি না।
আসল প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের রাজনীতি কি তরুণদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত?
কারণ সময় বদলেছে। প্রজন্ম বদলেছে। মানুষের প্রত্যাশাও বদলেছে। এখন শুধু নতুন মুখ দিয়ে হবে না, প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
স্লোগানের রাজনীতি নয়-সমাধানের রাজনীতি। ব্যক্তিপূজা নয় – জবাবদিহিতা। প্রতিশ্রুতি নয় বাস্তবায়নের প্রমাণ।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত এখানেই।

