বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা জিরো কস্টে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিতে। আজ শুক্রবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের আমলে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট আর নানা অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার তুলনামূলক স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, যার ফলাফল হিসেবেই এই সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি নতুন নিয়মে চলছে না। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একচেটিয়াভাবে মালয়েশিয়া সরকারের হাতে। মন্ত্রণালয় একে সাবেক সরকারের দুর্বল কূটনৈতিক অবস্থানের ফল বলে অভিহিত করেছে। যেহেতু ওই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল, তাই এই শর্ত এখনই বদলানো সহজ নয়। তবু বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বিমান ভাড়াসহ সব অভিবাসন খরচ বাদ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে প্রথম ব্যাচের কর্মীরা মালয়েশিয়া যাবেন। অর্থাৎ এই কর্মীদের কোনো টাকাই খরচ করতে হবে না।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা কর্মী সরবরাহকারী পাঁচটি প্রধান দেশ থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের একটি কাঠামো ঠিক করে দিয়েছে। এতে নেপাল ও বাংলাদেশ প্রতিটি ২৫টি করে এজেন্সি পেয়েছে, আর ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার পেয়েছে ১০টি করে। বাংলাদেশের এই ২৫টি এজেন্সি আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা থেকে বাছাই করা।
সরকার অনুরোধ জানিয়েছিল, যেসব এজেন্সি আগের সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে সুযোগ দেওয়া হোক। এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার সরাসরি ২৫টি এজেন্সি নির্বাচনের পাশাপাশি আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী বা অ্যাসোসিয়েট এজেন্সি হিসেবে কাজের সুযোগ দিয়েছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলও যুক্ত থাকছে। ফলে মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান একযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে, যাকে মন্ত্রণালয় একটি বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছে।
এজেন্সি বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছে মালয়েশিয়ার একাধিক মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, এই যাচাই-বাছাইয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল না। আগামী ডিসেম্বরে বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হলে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
দ্রুত শ্রমবাজার চালুর স্বার্থে সরকার বিদ্যমান মেডিক্যাল সেন্টারগুলো নিয়েও পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। যেহেতু মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি যৌথ প্রতিনিধি দল সরেজমিনে বাংলাদেশে এসে প্রতিটি কেন্দ্র পরিদর্শনের পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে, তাই পুরো প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে। আপাতত আগের সরকারের সময়ের বিতর্কিত কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি মেডিক্যাল সেন্টার দিয়েই কার্যক্রম শুরু হবে। পরে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দল আবার বাংলাদেশে আসবে।
কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিমানবন্দরে অতীতের মতো কোনো হয়রানি যেন না হয়, কর্মীরা যেন সরাসরি নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন, থাকার ব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা পান, তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ দ্রুত সমাধানে ২৪ ঘণ্টার একটি মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালু করবে মন্ত্রণালয়।
শ্রমবাজার খোলার এই খবরকে কেন্দ্র করে বাজারে নানা রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ধরনের গুজব প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, মালয়েশিয়ায় ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হবে, তার প্রস্তুতি এখনো চলছে এবং যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সবাইকে জানানো হবে।
তাই আগ্রহী কর্মীদের প্রতি কড়াভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছাড়া কেউ যেন কোনো ধরনের টাকা লেনদেন না করেন, মেডিকেল টেস্ট না করান এবং পাসপোর্ট জমা না দেন। দালাল বা প্রতারক চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে এই সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু বেকারত্ব কমাতেই সহায়ক হবে না, বরং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং অভিবাসন ব্যয় ন্যূনতম রাখাই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড।

