দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা বৈদ্যুতিক মিটারের বিপরীতে প্রকৃত ব্যবহার যাচাই না করেই মাসের পর মাস একই অংকের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিলের নথিপত্র ঘেঁটে অন্তত নয়টি ভবন ও হলে এমন অস্বাভাবিক চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে গত প্রায় তিন বছরে মোট প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়েছে কোনো প্রকৃত মিটার রিডিং ছাড়াই।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য বলছে, মিটার সচল না থাকায় প্রকৌশল বিভাগ প্রতিবার একটি আনুমানিক গড় অংক ধরেই বিল তৈরি করেছে, আর সেই একই অংক টানা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কত টাকা বেশি বা কম দিয়েছে, তা নিরূপণ করার কোনো সুযোগই ছিল না।
যেসব ভবনে এই সমস্যা ধরা পড়েছে তার মধ্যে রয়েছে সামাজিক বিজ্ঞান ভবন, কলা ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস, উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, একটি ছাত্রী হল, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, একটি একাডেমিক ভবন এবং একটি হোস্টেল।
সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালের শুরু পর্যন্ত আট মাস প্রতি মাসে পাঁচ লাখ ৩১ হাজার টাকার কিছু বেশি বিল করা হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত একটানা ২১ মাস প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার টাকা করে বিল ধরা হয়। এভাবে তিন দফায় অংক বদলে মোট তিন বছরে প্রায় দুই কোটি পাঁচ লাখ টাকার বিল লেখা হয়েছে এই একটি ভবনেই।
কলা ভবনের মিটারটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অকেজো বলে জানা যায়। এরপর টানা ১৩ মাস প্রতি মাসে আট লাখ ২০ হাজার টাকার কাছাকাছি একই অংকের বিল দেওয়া হয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারেও একই চিত্র। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস প্রায় সাত লাখ টাকা করে, এরপর পরবর্তী ২১ মাস প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা করে বিল করা হয়েছে। মোট ৩৯ মাসে এই একটি মিটারের বিপরীতেই বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি ৮৪ লাখ টাকায়।
গবেষণা কেন্দ্রটিতে ১১ মাস এবং পরবর্তী সাত মাস মিলিয়ে প্রায় ৩০ মাসে বিল হয়েছে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে নয় মাসে বিল হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা। ছাত্রী হলটিতে ১৭ মাস ধরে একই অংকে বিল হয়ে মোট দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে তিন দফায় মোট ৩১ মাসে বিল হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। একাডেমিক ভবনটিতে ৪৪ মাস ধরে বিভিন্ন দফায় বিল হয়ে মোট দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
তবে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঘটনা পাওয়া গেছে একটি হোস্টেলের ক্ষেত্রে। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় আট বছর পাঁচ মাস সময়জুড়ে একই মিটারের বিপরীতে একাধিক দফায় বিল করা হয়েছে, যার সর্বমোট পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এই নয়টি স্থাপনার হিসাব একত্র করলে নষ্ট মিটারের বিপরীতে মোট বিলের অংক দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকায়, যার পুরোটাই প্রকৃত ব্যবহারের বদলে অনুমাননির্ভর গড় হিসাবে করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বিভিন্ন ভবনে মিটার নষ্ট থাকায় প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার বোঝার কোনো উপায় নেই বলেই গরম ও শীতকালের গড় ব্যবহার হিসাব করে বিল মেটানো হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি ঐতিহাসিক ভবনে নষ্ট মিটারে মাসিক বিল ছিল প্রায় তিন লাখ টাকা, কিন্তু মিটার মেরামতের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ টাকায়। তার ভাষ্যে, কিছু ভবনের জন্য নতুন মিটার আনা হলেও তা এখনো স্থাপন করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বর্তমানে মোট আটটি মিটার নষ্ট অবস্থায় রয়েছে এবং নতুন মিটার বসানোর জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে পাঁচটির কাজ চলমান। তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে দীর্ঘদিন এই সমস্যার সমাধান হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নষ্ট মিটারের কারণে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা প্রথমে আনুমানিক বিল তৈরি করে, যা পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্রিয়াজাত করে পরিশোধ করে এবং পুরো বিষয়টি সরবরাহকারী সংস্থাও অবগত।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার একজন প্রকৌশলী স্বীকার করেছেন যে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতি রয়েছে, কারণ তারা অনুমাননির্ভর হিসাবের ভিত্তিতেই দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ করে আসছে। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়মবহির্ভূত কিনা, সে প্রশ্নে তিনি সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ বলেন, তার কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই এবং তিনি হিসাব পরিচালক বা প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নিজেও বিষয়টি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তিনি নিজেও বিস্তারিত জানতেন না এবং বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখবেন।
প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা একজন উপ-উপাচার্য বলেছেন, সঠিক তথ্যপ্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর ধরে কীভাবে কোনো তদারকি ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিল অনুমাননির্ভর হিসাবে পরিশোধ হয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতিরই প্রতিফলন, এবং অবিলম্বে সব নষ্ট মিটার প্রতিস্থাপন করে স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা চালু না করলে ভবিষ্যতে এই আর্থিক অস্বচ্ছতা আরও বাড়তে পারে।

