ঢাকার অনেক এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্না নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক কুকার, বিশেষ করে ইনফ্রারেড ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে এসব পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উত্তরার সেক্টর-৩-এর বাসিন্দা জেসমিন আলমও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। প্রতিদিন সকালে রান্নার সময় গ্যাসের চুলায় পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ায় তিনি ৭ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি ইনফ্রারেড কুকার কিনেছেন। পাশাপাশি রান্নার কাজ সহজ করতে নিয়েছেন রাইস কুকারও।
গত ২২ জুলাই দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) সমস্যার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ। এর প্রভাব পড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ির গ্যাস সরবরাহে।
চলতি সপ্তাহে কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কয়েক সপ্তাহের সংকটে বৈদ্যুতিক রান্নার সরঞ্জামের বাজারে চাহিদা বেড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বৈদ্যুতিক কুকারের বার্ষিক বাজার ২০০ কোটি টাকারও কম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইনফ্রারেড ও রাইস কুকারের বিক্রি দ্রুত বাড়ছে।
আরএফএলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মুর্শিদ মুনিম জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইনফ্রারেড কুকারের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। রাইস কুকারের বিক্রিও বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ।
তিনি বলেন, গ্যাসের পরিবর্তে মানুষ ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে ঝুঁকছেন। এর মধ্যে ইনফ্রারেড কুকার বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কারণ এগুলো ব্যবহারে আলাদা ধরনের হাঁড়ি-পাতিল প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, ইনডাকশন কুকারের জন্য বিশেষ পাত্র দরকার হওয়ায় এর চাহিদা তুলনামূলক ধীরে বাড়ছে।
চাহিদা সামাল দিতে আরএফএল গত বছরের তুলনায় বৈদ্যুতিক কুকারের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চাহিদা বৃদ্ধির গতি উৎপাদন সক্ষমতার চেয়েও বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব প্রতিষ্ঠানটির ঘোড়াশালের ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের উৎপাদন কার্যক্রমেও পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।
দেশে বৈদ্যুতিক কুকার উৎপাদন করছে ওয়ালটন, কিয়ামসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে এসব পণ্য আমদানি করছে। বাজারে ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো ও ফিলিপসের কুকার পাওয়া যাচ্ছে। ইনফ্রারেড কুকারের দাম সাধারণত ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে, তবে উন্নত মডেলের দাম আরও বেশি।
ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্সের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনাইদ বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাস সংকটের মধ্যে তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের চাহিদা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে গ্রাহকদের কাছে বৈদ্যুতিক কুকার নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ওয়ালটনের বাজারে ১২ থেকে ১৫ ধরনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার রয়েছে। এসব মডেলের দাম ৩ হাজার ৭৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকা পর্যন্ত।
তবে বাজারের সব প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে না। কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান হায়দার জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের বিক্রিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রেসার কুকার, ফ্রাইং প্যান, ক্যাসেরোল, অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য ও হটপটের মতো অন্যান্য সামগ্রী।
সব মিলিয়ে, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা রাজধানীর অনেক পরিবারের রান্নার অভ্যাসে পরিবর্তন আনছে। সাময়িক সংকট হিসেবে শুরু হলেও বৈদ্যুতিক কুকারের বাড়তি চাহিদা এখন গৃহস্থালির রান্নার সরঞ্জামের বাজারেও নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

