এক সময় দেশের নদী-নালা, খাল-বিলে অনায়াসেই পাওয়া যেত রানি, কুর্শা, পিয়ালি, বাতাসি, কাকিলার মতো নানা সুস্বাদু দেশীয় মাছ। কিন্তু জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া, প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়া, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং রাসায়নিক সার-কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এসব মাছ ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে সুখবর হলো, বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় এসব মাছ আবার ফিরে আসছে বাংলাদেশের মানুষের পাতে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ৪১টি বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন, আর আরও তিনটি প্রজাতি শিগগিরই প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন ছোট মাছ উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত দেশি জাত থেকেই আসছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন। দেশের বার্ষিক মাছের মোট চাহিদা প্রায় ৪২ লাখ টন হলেও বর্তমানে উৎপাদন সেই চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত অবস্থায় রয়েছে। তার মতে, বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশ ও বিদেশের বাজারে এদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও যথেষ্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একসময় দেশে প্রায় ২৬১টি দেশি মিঠাপানির মাছের প্রজাতি থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার মধ্যে ৬৪টিই হারিয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা বাংলাদেশের প্রায় ৫৬টি দেশি মিঠাপানির মাছকে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছ নিয়ে গবেষণা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে, পাবদা মাছকে কেন্দ্র করে। এরপর গত চার দশকে ৪১টি মাছের জাত উন্নয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ২০টি জাতই উন্নয়ন হয়েছে গত এক দশকে। সর্বশেষ সংযোজন কুর্শা মাছের জাত, যা মূলত দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি নদীতে পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটি কেন্দ্র ও পাঁচটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনা করে এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গবেষণার ক্ষেত্রে এটিই দেশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আশির দশকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরের বছর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত প্রায় সব মাছের জাতই এখন কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে দেশি মাছ উৎপাদনের স্থানীয় কেন্দ্র গড়ে উঠছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন সাবেক পরিচালক জানান, তুলনামূলক কম খরচেই পুকুরে এসব মাছের প্রজনন ও চাষ সম্ভব। বর্তমানে কৃষকরা পাবদা, বোয়ালি, বাটা, চিতল, মহাশোল, ফলি, ঢেলা, গজার, শিং, মাগুর, আইড়সহ বিভিন্ন দেশি প্রজাতি চাষ করছেন।
গবেষকদের মতে, রঙিন কিছু দেশি মাছ যেমন দারকিনা, খলিশা, মেনি, টেংরা, রানী ও গুতুমের বিদেশে অ্যাকুরিয়াম মাছ হিসেবেও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে, ফলে এসব প্রজাতির রপ্তানি সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
তিন দশক আগেও দেশের মিঠাপানির মাছের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আসত নদ-নদী থেকে, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশে। তবে সংস্থাটির একজন সাবেক মহাপরিচালকের ভাষ্যে, গত ১৫ বছরে দেশি ছোট মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ, যা এই খাতের ইতিবাচক অগ্রগতির একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
দেশি ছোট মাছ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি বিশেষ ‘লাইভ জিন ব্যাংক’ স্থাপন করে। মোট ১৪৩টি ক্ষুদ্র দেশি মাছের প্রজাতির মধ্যে এ পর্যন্ত ১০২টি প্রজাতি এই ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের ভাষায়, প্রকৃতি থেকে কোনো প্রজাতি হারিয়ে গেলেও জিন ব্যাংকের সংরক্ষিত মাছ দিয়ে হ্যাচারিতে প্রজনন ঘটিয়ে পরে সেগুলো উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা সম্ভব।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ লাখ কৃষক দেশি ছোট মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং ৫০০টিরও বেশি হ্যাচারিতে এসব মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটিরও বেশি মানুষ এই মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ছয় লাখ মানুষ এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার এক মাছচাষি, যিনি প্রায় ৩২ বছর আগে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন, বাজারে দেশি ছোট মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার পর এই খাতে বিশেষভাবে আগ্রহী হন। বর্তমানে তিনি ২০টি পুকুরে মলা, ঢেলা, তারা বাইম, ভ্যাংনা ও দেশি পুঁটির মতো বিভিন্ন মাছের পোনা উৎপাদন করে দেশের একাধিক জেলায় সরবরাহ করছেন, যা থেকে তিনি ভালো মুনাফাও করছেন। শুরুর দিকে গবেষকরা তাকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিলেন এবং নিয়মিত তার খামার পরিদর্শন করতেন।
একইভাবে ফুলপুর উপজেলার আরেকজন হ্যাচারি মালিক ২০০৩ সাল থেকে গবেষকদের সহায়তায় দেশি ছোট মাছ চাষ করছেন এবং এখন বড় পরিসরে তারা বাইমের পোনা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার প্রত্যাশা, আগামী তিন বছরের মধ্যে এই মাছের চাষ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে, কারণ বর্তমানে আকারভেদে প্রতি কেজি তারা বাইম বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে বারোশ টাকায়—যা এই মাছের ভালো বাজারমূল্য ও চাহিদার প্রমাণ দেয়।
ফুলবাড়িয়া উপজেলার আরেকজন মাছচাষি জানান, দেশি ছোট মাছ চাষে খরচ তুলনামূলক কম, স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা বেশি হওয়ায় লাভও সন্তোষজনক। এমনকি কার্পজাতীয় মাছের সঙ্গেও একই পুকুরে এসব দেশি প্রজাতি চাষ করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মহাপরিচালক জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ৫৫টি অ্যাকুয়াকালচার ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যার অধিকাংশই মাছ উৎপাদন বাড়াতে ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। থাই পাঙ্গাস, বিশেষ জাতের তেলাপিয়া, দেশি-বিদেশি কার্প এবং কুঁচিয়া নিয়ে গবেষণাতেও তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। মৎস্য গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশি মাছের এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাই নয়, বরং লাখো প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

