রাজশাহীর সড়কগুলোতে দিনের আলোয়ও বেপরোয়াভাবে ছুটে চলছে ভারী ট্রাক আর ডাম্প ট্রাক, আর তার পরিণতিতেই একের পর এক ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। গত এক বছরের হিসাব বলছে, শুধু এই জেলাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন মানুষ, যা একটি জেলার জন্য উদ্বেগজনক সংখ্যা। যদিও অনেকেই দুর্ঘটনার জন্য মূলত ট্রাক ও বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলকে দায়ী করছেন, তবে পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা—মোটরসাইকেলও এই দুর্ঘটনার তালিকায় সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কারণ—আইন না মানার প্রবণতা, অতিরিক্ত গতি, চালকদের দক্ষতার ঘাটতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং সার্বিক তদারকির দুর্বলতা। এসব কারণেই প্রতিনিয়ত সড়কে প্রাণ ঝরছে বলে মনে করছেন তারা।
চলতি বছরের ৫ মে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার একটি এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একটি ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় স্থানীয় এক দোকানির মৃত্যুর পর এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যার জেরে ক্ষুব্ধ জনতা দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দীর্ঘসময় ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই ডাম্প ট্রাকগুলো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলাচল করলেও এতদিন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এর কিছুদিন আগে, বছরের শুরুতে ১ জানুয়ারি একই মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজার এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক সরাসরি বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান চারজন এবং আহত হন আরও কয়েকজন। এর কয়েক সপ্তাহ পর ২৬ জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় একটি বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন। বছরের শুরু থেকে ঘটে চলা এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনাগুলো রাজশাহীর সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করে তুলেছে।
জেলা ও মহানগর পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মোট ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে—এর মধ্যে জেলায় ১৩৫টি ও মহানগর এলাকায় ৩৪টি। এসব দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে প্রাণ গেছে ১৬০ জনের, আর এসব ঘটনায় দায়ের হয়েছে সমসংখ্যক মামলা। পরিসংখ্যান আরও বলছে, মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট, আর প্রায় ৪০টি ঘটনায় জড়িত ছিল ট্রাক বা ডাম্প ট্রাক।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি, মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেসের যানবাহন এবং মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ ধীরগতির যানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। বিশেষভাবে অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ডাম্প ট্রাক—ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বালু বা মাটি বহনের কারণে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ব্রেক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে, আবার অনেক ট্রাকে সুরক্ষা কভার না থাকায় ধুলাবালি উড়ে অন্য চালকদের দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। তাদের মতে, শুধু ডাম্প ট্রাককে দোষারোপ করা যৌক্তিক নয়, কারণ বাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলসহ প্রায় সব ধরনের যানবাহনই কোনো না কোনোভাবে দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা আরও মনে করেন, দুর্ঘটনার পর গাড়িতে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর চালানো কোনোভাবেই আইনসম্মত পথ নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করাই সঠিক পদ্ধতি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাজশাহীতে বর্তমানে ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক থাকলেও যানবাহনের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় সড়ক অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এগোয়নি বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতা জানান, মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য পৃথক লেন না থাকায় এসব যান অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে, আর এসব যানের অনেক চালকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। তিনি এও বলেন, মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা ও হাটবাজারের কারণে সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে, যা দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ। তার পরামর্শ, মহাসড়কগুলো ধাপে ধাপে চার লেনে উন্নীত করা এবং হালকা যানবাহনের জন্য আলাদা লেন তৈরি করা গেলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের স্থানীয় প্রতিনিধি মনে করেন, প্রয়োজনীয় প্রশস্ত সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতি, চালকদের অসতর্কতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবই মূল সমস্যা। তার মতে, সবচেয়ে বড় সংকট হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব, আর ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলেই দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি রাজশাহীর সড়কে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিকেই নিরাপদ বলে উল্লেখ করেন, এর বেশি গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলে সতর্ক করেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নগরীতে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ মানুষের সচেতনতার ঘাটতি এবং বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই অনেকের গাড়ি চালানো। তিনি জানান, দুর্ঘটনা কমাতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মশালা পরিচালনা করা হচ্ছে এবং চালক ও পথচারী উভয় পক্ষের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সবমিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট যানবাহনকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না—বরং সড়ক অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসাধারণের সচেতনতা—এই চার স্তম্ভে সমন্বিত উদ্যোগ নিলেই রাজশাহীর সড়কে প্রাণহানির এই ধারাবাহিকতা রোধ করা সম্ভব হবে।

