মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো সম্ভাবনার নাম নয়। বহু বছর ধরে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে কাজ করে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু এই শ্রমবাজারের সম্ভাবনার আড়ালেই দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা ‘সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য’।
আর এ বিষয়টি শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যবসায়ীর অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, শ্রমিকের অধিকার, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ব্যয় এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ।
শ্রমবাজার যখন ‘বাণিজ্যিক পণ্য’
বিদেশে চাকরি একজন শ্রমিকের জন্য নিছক একটি চাকরি নয়। অনেকের কাছে এটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার শেষ আশ্রয়। জমি বিক্রি, ঋণ, ধারদেনা কিংবা পরিবারের সঞ্চয় দিয়ে একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যখন একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত হয়, তখন চাকরির সুযোগটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক পণ্যে।
ফলে যে চাকরির জন্য একজন শ্রমিকের কাছ থেকে যৌক্তিক পরিমাণ অর্থ নেওয়ার কথা, সেখানে তাকে দিতে হয় অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা। শেষ পর্যন্ত বিদেশে পৌঁছানোর আগেই শ্রমিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন।
আর এখানেই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
লাভ কার, দায় কার?
সিন্ডিকেটের কাঠামো সাধারণত এমনভাবে তৈরি হয় যেখানে শ্রমিক সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ, অথচ ঝুঁকিটা সবচেয়ে বেশি তারই।
নিয়োগের নামে টাকা নেওয়া হয়, নানা ধরনের ফি যোগ হয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন যুক্ত হয় কিন্তু চাকরি না হলে কিংবা প্রতিশ্রুত চাকরির সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকলে শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা অনেক সময় থাকে না।
অর্থাৎ লাভের কাঠামোতে শ্রমিকের টাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দায়ের কাঠামোতে শ্রমিকের অধিকার সবচেয়ে দুর্বল। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে বিদেশে কর্মসংস্থান দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ হলেও সাধারণ শ্রমিকের জন্য তা থেকে যাবে ঋণ, অনিশ্চয়তা ও শোষণের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা।
সিন্ডিকেট শুধু মালয়েশিয়ার সমস্যা নয়
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ঘটনাটি বাংলাদেশের বৃহত্তর অভিবাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাকেও সামনে আনে। কোনো একটি দেশের শ্রমবাজার যখন নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সেখানে প্রতিযোগিতা কমে এবং কৃত্রিমভাবে ব্যয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এর ফলে তিনটি পক্ষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
প্রথমত, শ্রমিক।
তাকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বৈধ ও সৎ রিক্রুটিং এজেন্সি।
সিন্ডিকেটের কারণে তারা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্র।
অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং অভিবাসনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমাধান কি শুধু সিন্ডিকেট ভাঙা?
না। শুধু একটি সিন্ডিকেটের জায়গায় আরেকটি সিন্ডিকেট তৈরি হলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থাটির কাঠামোগত সংস্কার।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কোন নিয়োগকর্তা কতজন কর্মী নিচ্ছে, চাকরির বেতন কত, নিয়োগ খরচ কত এবং কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাচ্ছে এসব তথ্য প্রকাশ্য করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ অনেকটাই কমবে।
একই সঙ্গে নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার পর অভিযোগ নেওয়া নয়; অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে দেশ ছাড়ার আগেই।
সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশে কর্মসংস্থানের বাজারকে পুরোপুরি বেসরকারি ব্যবসার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ এটি একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়।
সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত
– নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা;
– মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা;
– নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় কঠোরভাবে কার্যকর করা;
– প্রতিটি নিয়োগের তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা;
– প্রতারণার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা;
– ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের অর্থ ফেরতের কার্যকর ব্যবস্থা করা;
– গন্তব্য দেশের সঙ্গে সরাসরি সরকারি পর্যায়ে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সরকার-টু-সরকার নিয়োগব্যবস্থা যতটা সম্ভব সম্প্রসারণ করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
শ্রমিককে ‘রাজস্বের উৎস’ নয়, নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান বিশাল। তারা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বিদেশে যাওয়ার সময় এই শ্রমিকদের অনেকেই যেন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিবর্তে একটি জটিল দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্র যদি একজন শ্রমিকের বিদেশযাত্রাকে শুধু রেমিট্যান্স আয়ের হিসাব দিয়ে দেখে, তাহলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না।
বরঞ্চ জানা উচিত একজন শ্রমিক কত টাকা আয় করে দেশে পাঠালেন, তার আগে বিদেশে যেতে তাকে কত টাকা খরচ করতে হলো?
এই হিসাবটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমবাজার খুললেই হবে না, দরজাটি কার হাতে সেটিও দেখতে হবে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের অবসানের দাবি তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দেশের শ্রমবাজারের দাবি নয়। এটি বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার দাবি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ যতই বাড়ুক, যদি সেই সুযোগের দরজায় কয়েকজন মধ্যস্বত্বভোগী পাহারাদার হয়ে বসে থাকেন, তাহলে শ্রমিকের জন্য সেই সুযোগ কতটা অর্থবহ সেটিই বড় প্রশ্ন।
একজন শ্রমিক তার জীবনের সঞ্চয়, পরিবারের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদেশে যান। সেই স্বপ্নের ওপর কোনো সিন্ডিকেটের মুনাফার অধিকার থাকতে পারে না।
B(বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং শ্রমিকবান্ধব।)
কারণ বিদেশে কর্মসংস্থান কোনো দয়া নয়; এটি একজন নাগরিকের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অধিকার এবং রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ।

