দেশে সারের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট শুধু কৃষকের মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়—এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিলেও। সময়মতো সার না পেলে আমন ধানের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর উৎপাদন কমলে বাড়তে পারে চালের দাম। বিশ্বব্যাংকের এক সতর্কবার্তা বলছে, চালের দাম মাত্র ১০ শতাংশ বাড়লেও নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
বিশ্ববাজারে সারের দাম নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এরই মধ্যে বছরের প্রথম তিন মাসে সারের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর, কারণ দেশের সারের চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বছরে দেশে প্রায় ৬৬ লাখ টন সার প্রয়োজন হয়। এর ৮৫ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আবার মোট সারের প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যবহার হয় ধান উৎপাদনে।
আমদানিনির্ভরতায় বাড়ছে ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ডিএপি সারের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছিল শুধু সৌদি আরব থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের সার সরবরাহেও পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সংকট। গ্যাসের অভাবে সাতটি সার কারখানার মধ্যে তিনটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর আগে বিশ্বব্যাংকও জরুরি সার আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে সময়মতো সার সরবরাহের ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে।
এই অর্থায়নের লক্ষ্য মূলত চলতি আমন এবং পরবর্তী বোরো মৌসুমের জরুরি চাহিদা পূরণ করা। এটি দীর্ঘমেয়াদি সার চাহিদা বা নিয়মিত ভর্তুকি দেওয়ার জন্য নয়।
আমন-বোরোর ওপর বড় চাপ
জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে আমন মৌসুম। এরপর অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুম। দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি আসে এই দুই মৌসুম থেকে। এ সময়েই প্রয়োজন হয় ৪৩ লাখ টনের বেশি রাসায়নিক সার।
কৃষকেরা সময়মতো সার না পেলে এর ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। এতে ধানের ফলন কমার আশঙ্কা রয়েছে। আর ধানের উৎপাদন কমলে খাদ্যবাজারে দ্রুত তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় চালের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশই চলে যায় চাল কেনার পেছনে। ফলে চালের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হবে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র কৃষক
বাংলাদেশের মোট কৃষক পরিবারের প্রায় ৯২ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। তারা দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৬৫ শতাংশ চাষ করেন। সার পাওয়া না গেলে কিংবা সারের দাম বেড়ে গেলে এই কৃষকদের ওপরই সবচেয়ে বড় চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কৃষিকাজের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয়। মানুষের দৈনিক ক্যালরি চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশ পূরণ হয় চালের মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলের প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
তাই কৃষিতে কোনো বড় ধরনের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্যের দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দারিদ্র্যের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
মজুত থাকলেও কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না?
সরকারের হিসাবে দেশে এখনো পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সব ধরনের সারের নিরাপত্তামজুত প্রায় ১৭ লাখ টন। এই মজুত দিয়ে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ধরনের অভিযোগ। দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কোথাও কোথাও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকায় কৃষকেরা সার ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি এলাকায় সার সরবরাহের দাবিতে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে দেশে প্রায় ১৮ লাখ টন সার মজুত ছিল। ২৪ আগস্ট সেই মজুত কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ টনে।
এ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ২৫ আগস্ট একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। সার বিতরণব্যবস্থা এবং ডিলার নিয়োগের বিষয় পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার কথা রয়েছে কমিটির।
অন্যদিকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের ঘাটতি নেই। তাঁর দাবি, একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বেশি দামে সার বিক্রি বা টাকা না দিলে সার না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের চোখে মূল সমস্যা বিতরণে
কৃষি অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামানের মতে, সরকারি হিসাবে যদি পর্যাপ্ত সার মজুত থাকে, তাহলে সংকটের মূল কারণ খুঁজতে হবে বিতরণব্যবস্থায়। তাঁর ভাষায়, গুদামে সার পড়ে থাকলেই হবে না; সেটি সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের সার পেতে ডিলারের গুদামে যেতে হচ্ছে কিংবা বিক্ষোভ করতে হচ্ছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কোথাও না কোথাও ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, আমন ধান এখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে যখন প্রয়োজনীয় সার না পেলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ধানে ফুল আসার সময় প্রয়োজনীয় সার না পেলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমনের ফলন যদি ১৫ থেকে ২০ শতাংশও কমে যায়, তাহলে এর প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ পরবর্তী বড় ধানের মৌসুম বোরোর ফসল কৃষকের ঘরে উঠতে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আগে আমন মৌসুমে ধানের সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে খরা বা পানির ঘাটতিকে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে সার সংকটই বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধানের চাষ আমন মৌসুমেও বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনে সারের প্রয়োজনীয়তাও অনেক বেড়েছে।
সরকারের গঠিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আসাদুজ্জামান এতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা, সার ডিলার ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ডিলার নিয়োগ ও সার বরাদ্দে কোনো স্থানীয় প্রভাব বা অনিয়ম আছে কি না, তা দ্রুত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে সারের বর্তমান সংকট এখন শুধু কৃষি খাতের সমস্যা নয়। সময়মতো সার কৃষকের হাতে পৌঁছানো না গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে ধানের ফলনে, এরপর চালের দামে—আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হতে পারে দেশের নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায়।

