সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হলেও সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকার জানিয়েছে, দেশের আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমানো হয়েছে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:১ দশমিক ৯৪৫ থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা কমে ১:১ দশমিক ৭৮ হবে।
এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়বে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন বাড়বে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হলেও পুরো কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তিন ধাপে কার্যকর করা হবে। তুলনামূলকভাবে কম আয়ের কারণে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিভিন্ন ধরনের ভাতা অবশ্য একসঙ্গে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিট পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
সরকার জানিয়েছে, দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং বর্তমানে তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতেই এই ব্যবস্থায় বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘এক পদ, এক পেনশন’ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের মোবাইল ভাতার সুবিধাও এবার বাড়ানো হয়েছে। আগে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীরা এই সুবিধা পেলেও নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডের কর্মচারীরাই মোবাইল ভাতা পাবেন। সরকারি দপ্তরে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে এমন সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন সুবিধা চালু করা হচ্ছে। একজন কর্মচারী প্রতিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী। এর পাশাপাশি ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য ব্যক্তিও এর আওতায় আসবেন। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
এদিকে বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এটিও ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে অর্থ বিভাগ। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ, ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধা কার্যকরের বিস্তারিত প্রক্রিয়া তুলে ধরা হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতিতে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মস্পৃহা বাড়ার মাধ্যমে সরকারি প্রশাসনে দক্ষতা ও জনসেবার মান আরও উন্নত হবে।

