দ্বীপজেলা ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর বরিশালের সঙ্গে সংযোগ কোন পথে হবে, তা নিয়ে সম্প্রতি জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতুর পাশাপাশি নতুন করে সামনে এসেছে ভোলা-মেহেন্দিগঞ্জ সড়ক নির্মাণের একটি প্রস্তাব, আর এই দুই বিকল্পকে ঘিরেই এখন স্থানীয় জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভোলাবাসীর বহুদিনের দাবি ছিল বরিশালের সঙ্গে সরাসরি সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়ার। প্রস্তাবিত এই সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় এগারো কিলোমিটার, আর সেতু ও সংযোগ সড়ক মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায়। এই আলোচনা চলাকালেই দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করতে বিকল্প হিসেবে ভোলা-মেহেন্দিগঞ্জ সড়ক নির্মাণের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। তবে অনুমোদিত এই সড়ক প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় কত হবে, তা নিয়েও রয়েছে মতভেদ।
সড়কপথের বদলে সরাসরি সেতুর মাধ্যমে ভোলাকে বরিশালের সঙ্গে যুক্ত করার দাবিতে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন ভোলার একদল বাসিন্দা। এই ঘটনার পর থেকেই সড়ক নাকি সেতু—কোন বিকল্পটি ভোলাবাসীর জন্য বেশি কার্যকর, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে।
দুটি প্রস্তাবের মধ্যে খরচ, দূরত্ব ও সময়ের হিসাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সড়কপথের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঢাকা থেকে দূরত্ব দাঁড়াবে প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। এই সড়ক নির্মাণে সময় লাগবে প্রায় চার বছর, আর টোলের পরিমাণও তুলনামূলক কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা, আর ঢাকা থেকে দূরত্ব দাঁড়াবে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার—অর্থাৎ সড়কপথের তুলনায় বাড়তি প্রায় সত্তর কিলোমিটার। সেতু নির্মাণে সময় লাগতে পারে দীর্ঘ বারো বছর, আর টোলের পরিমাণ হতে পারে পদ্মা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ ব্যয় ও নির্মাণকালের হিসাবে সেতু প্রকল্পটি সড়কপথের চেয়ে অনেক বড় ও দীর্ঘমেয়াদি হলেও, দূরত্বের হিসাবে তা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই দ্বিমুখিতাই মূল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ পদ্ধতিতে ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দিয়েছে জাপানের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই উদ্যোগের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা যায়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার, আর এর জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। এই নির্মাণ ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ হিসেবে সরবরাহ করবে জাপান, আর সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধের দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ সরকারের ওপর। সবকিছু মিলিয়ে প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই বিকল্পের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে স্বল্পমেয়াদি ব্যয়-সাশ্রয় বনাম দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ-সুবিধার প্রশ্নে। সড়কপথ তুলনামূলক কম খরচে ও কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য হলেও তা ভোলাবাসীকে সরাসরি বরিশালের সঙ্গে যুক্ত করে না, বরং ঘুরপথে মেহেন্দিগঞ্জ হয়ে সংযোগ ঘটায়। অন্যদিকে সেতু প্রকল্প সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করলেও তার নির্মাণ ব্যয় ও সময়—উভয়ই অনেক বেশি, আর টোলের বোঝাও তুলনামূলক ভারী হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে ভোলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যোগাযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরাসরি সেতুই টেকসই সমাধান, যদিও তার জন্য বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে তারা প্রস্তুত। অন্যদিকে সরকারি পর্যায়ে স্বল্প ব্যয় ও দ্রুত বাস্তবায়নের যুক্তিতে সড়কপথকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপজেলা ভোলার লাখো মানুষের যাতায়াত-সংযোগ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ এখন কার্যত দুটি ভিন্ন উন্নয়ন দর্শনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে—স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত সমাধান, নাকি অধিক ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সরাসরি সংযোগ। শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে সরকার স্থির হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভোলার ভবিষ্যৎ যোগাযোগ-অবকাঠামোর দিকনির্দেশনা।

