ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুরের কারমাইকেল কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তীব্র আবাসন সংকটে ভুগছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে ১৫ বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া দুটি ছাত্রাবাস আজও চালু হয়নি।
ফলে বাধ্য হয়েই চড়া ভাড়ায় মেসে বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে সিংহভাগ শিক্ষার্থীকে। সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ সাংবাদিক এস দিলীপ রায়ের লেখা এক বিশেষ প্রতিবেদনে কারমাইকেল কলেজের এই চরম আবাসন সংকট ও জরাজীর্ণ ছাত্রাবাসগুলোর বর্তমান করুণ চিত্র বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২০ জুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের জেরে কলেজ প্রশাসন চারটি ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দেয়।
দীর্ঘ আট বছর পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২০১৯ সালে গোবিন্দ লাল (জিএল) এবং কাশিম বাজার ছাত্রাবাস খুলে দেওয়া হলেও কারমাইকেল মুসলিম ও এমএজি ওসমানী ছাত্রাবাস দুটি আজও বন্ধ রয়েছে।
বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ভবন দুটি এখন আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়েছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ার পাশাপাশি ভেতরে-বাইরে জমেছে আবর্জনার স্তূপ। বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া সেখানে শিক্ষার্থীদের বসবাসের আর কোনো উপায় নেই বলেই শিক্ষকরা জানিয়েছেন।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে কলেজটির আবাসন সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক, ২১টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
কিন্তু পাঁচটি ছাত্র ও চারটি ছাত্রীনিবাস মিলিয়ে মোট নয়টি হলের মধ্যে চালু থাকা সাতটি হলে আসন রয়েছে মাত্র ৯৫০ জনের মতো। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর চার শতাংশেরও কম আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন।
বাকি প্রায় ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই বাধ্য হয়ে বাইরের মেস বা বাসাবাড়িতে থাকতে হচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা হলগুলো হলো; ছাত্রদের জন্য গোবিন্দ লাল, কাশিম বাজার এবং নতুন নির্মিত শহীদ আবু সাঈদ হল; আর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বেগম রোকেয়া, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তাপসী রাবেয়া ও তারামন বিবি ছাত্রীনিবাস।
আবাসিক সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর যে চরম আর্থিক ও মানসিক চাপ পড়ছে, তা ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার রহমান ডেইলি স্টারকে জানান, মেসে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত মিলিয়ে প্রতি মাসে তার প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে হলে সিট পেলে এই খরচ তিন হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতো।
নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থাও অভিন্ন। বাংলা বিভাগের ইয়াসমিন আরার মতে, মেসের পরিবেশ পড়াশোনার জন্য মোটেও উপযোগী নয়। শুধু তাই নয়, নতুন নির্মিত শহীদ আবু সাঈদ হল ছাড়া চালু থাকা পুরোনো হলগুলোর অবস্থাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কাশিম বাজার ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থী সিয়াম সরকার জানান, মাঝেমধ্যেই ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়লেও বাড়তি খরচের ভয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা হলে থাকছেন।
এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনের উদ্যোগ সম্পর্কে কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল হোসেন মণ্ডল ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন যে, পুরোনো হলগুলো সংস্কারের জন্য এরই মধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এই সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা ছাত্রাবাস দুটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ও কলেজের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে আরও একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী হল নির্মাণের প্রস্তাব পাঠিয়েছে কলেজ প্রশাসন।

