আজ ১ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জন্মবার্ষিকী। গত ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে দীর্ঘদিন নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে অসুস্থ অবস্থায় জুন মাসের মাঝামাঝি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ফলে আজকের দিনটি তাঁর প্রয়াণের পর প্রথম জন্মদিন হিসেবে পালিত হচ্ছে — জন্মদিনের আনন্দ আর বিদায়ের বেদনা যেখানে মিলেমিশে আছে।
জন্ম ও পরিবার: মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর গানের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি স্ত্রী মেরীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন কাটান।
ভাষা আন্দোলন ও কারাবরণ: নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। তখন তিনি নারায়ণগঞ্জে তাঁর মেজো বোনের বাড়িতে থাকতেন। ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলা ভাষাকে অসম্মান ও প্রতিবাদ মিছিলে বাঙালিদের শহীদ হওয়ার খবর শুনে তিনি সেই প্রেক্ষাপটে ছবি এঁকে বন্ধুদের নিয়ে প্রতিবাদ জানান, আর এই দেশাত্মবোধ ও ছবি আঁকার “অপরাধে” কৈশোরেই তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।
শিক্ষা ও কর্মজীবন: মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন প্রভাষক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। এরপর ধাপে ধাপে তিনি দায়িত্ব পালন করেন-
*বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক
* বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক
* জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক
*বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা’র জেনারেল ম্যানেজার
* বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি)-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক
*জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান
*এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা
শিল্পকর্ম ও অবদান:
পাপেট শিল্পের বিকাশ: বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক হিসেবে পাপেট বা পুতুলনাচকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। পাপেট শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের লোককাহিনী সংরক্ষণ ও শিশুদের গল্প পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তিনি ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় ও কালজয়ী পাপেট চরিত্র “পারুল”, “বাঘা” ও “মিনি” বহু প্রজন্মের শৈশবের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
টেলিভিশন নাটক ও প্রযোজনা: টেলিভিশন নাটকে তাঁর অতুলনীয় কৃতিত্ব রয়েছে। বিটিভির শুরুর দিকে সেট ডিজাইন থেকে শুরু করে প্রোডাকশনের মান উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পরিচালক, টিভি অনুষ্ঠানের প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও তিনি সৃজনশীল শিল্পের নানা ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
“নতুন কুঁড়ি” ও “মীনা”: শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “নতুন কুঁড়ি” তিনিই নির্মাণ করেন। এ ছাড়া শিশুতোষ চরিত্র “মীনা”-র সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় আয়োজনে শিল্পীসত্তা: দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাসকট “মিশুক” তাঁরই পরিকল্পনা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকেও তিনি শিল্পের দৃষ্টিতে দেখতেন।
শহীদ মিনারের লাল সূর্য: ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনার অন্যতম স্থপতি ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
শিক্ষকতা: চারুকলায় তাঁর শিক্ষকতাজীবন দীর্ঘ না হলেও তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পকলার একজন উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডির বাইরেও তাঁর কাজের প্রভাব ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ছাত্ররা তাঁকে একজন “কমপ্লিট আর্টিস্ট” বা পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে স্মরণ করেন — ছবি আঁকা, পাপেট শো, নাটক পরিচালনা কিংবা সংগীত, সবক্ষেত্রেই যাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা।
ব্যক্তিত্ব: সহকর্মী ও ছাত্রদের বর্ণনায় মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অত্যন্ত উদার ও নিঃস্বার্থ একজন শিল্পী, যাঁর মধ্যে অন্য অনেক শিল্পীর মধ্যে দেখা যাওয়া আত্মকেন্দ্রিকতা বা খামখেয়ালিপনার ছিটেফোঁটাও ছিল না।
সম্মাননা: শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা *একুশে পদক* প্রদান করা হয়। ২০১৯ সালে তিনি “সুলতান পদক”-এ ভূষিত হন। এ ছাড়াও তিনি আরও নানা সম্মাননা লাভ করেছিলেন।
“বাংলাদেশের পাপেটম্যান” নামে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সত্যিকারের এক “কমপ্লিট আর্টিস্ট” — চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও শিক্ষক, একইসঙ্গে যিনি সব পরিচয়ে সফল। তাঁর ব্যবহৃত রং, নির্মিত প্রতীক, শেখানো ভাষা আর উদ্ভাবিত শিল্পরীতি আজও বাংলাদেশের মানুষের রুচি ও স্মৃতির মধ্যে জীবন্ত হয়ে আছে — সত্যিকার অর্থে কিছু শিল্পীর মৃত্যু হয় না, তাঁরা থেকে যান তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

