স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিবারের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান গত প্রায় দুই বছরে সরকারি সংস্থা থেকে ৭১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের কাজ বাগিয়ে নিয়েছে, যা নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন উঠেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন একটি চুক্তির আওতায় প্রায় সাড়ে পঁচিশ কোটি টাকার একটি কাজ দেয় বগুড়াভিত্তিক রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র দুই মাস পরই এই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ শেয়ারের মালিক প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম নিজে এবং তাঁর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত।
তবে এই চুক্তির শিকড় আরও আগের। খাবার লবণে আয়োডিন সংযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম আয়োডেট কেনার এই দরপত্র প্রকাশিত হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, যখন শাহে আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ওই সংস্থার পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যবসায়ী ও বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি পরিচয়ের শাহে আলমকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিলেন।
একাধিক চুক্তির নথি ঘেঁটে দেখা যায়, প্রায় দুই বছরের ব্যবধানে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস এবং প্রতিমন্ত্রীর ছেলের মালিকানাধীন আরেকটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে অন্তত ১২টি কাজের চুক্তি পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও মন্ত্রণালয় থেকে। এর মধ্যে শাহে আলম বিসিক পরিচালক থাকাকালে ছয়টি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে সাতান্ন কোটি টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আরও ছয়টি চুক্তির মাধ্যমে সাড়ে তেরো কোটি টাকার কাজ পাওয়া গেছে। এই বারোটি চুক্তির মধ্যে দুটি পেয়েছে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস, বাকি দশটি গেছে ছেলের প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে।
সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, এটি স্পষ্টতই স্বার্থের দ্বন্দ্বের একটি উদাহরণ। তাঁর মতে, শুধু সন্তান নয়, কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের কারও উচিত নয় তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়া। তিনি আরও বলেন, অতীতে এ ধরনের স্বজনপ্রীতি ব্যাপক থাকলেও মানুষ এখন আর সরকারি দরপত্রে এমন প্রবণতা দেখতে চায় না, এবং বিষয়টি সঠিক প্রমাণিত হলে দুর্নীতি দমন সংস্থার তদন্ত হওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন কাজের চুক্তি পেতে শাহে আলম সরাসরি তদবির করেছিলেন। সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পদে থাকা ব্যক্তিরা মুনাফালাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনায় অংশ নিতে পারেন না— এই বিধানের প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, এসব চুক্তির কোনোটিতেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। নিজের পদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তিনি নাকচ করে দেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগেই তাঁর ছেলের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে কাজ পেয়েছিল, এবং দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলফনামার মাধ্যমে অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আরেকজন সাবেক সচিব মন্তব্য করেন, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সন্তানেরা নিজেদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখলে সেটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবেই গণ্য হবে, এবং এত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এ ধরনের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শাহে আলম একাধিক ইস্যুতে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। গত মার্চে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে একজনকে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে অভিযোগ ওঠে যে এই নিয়োগে শাহে আলমের প্রভাব ছিল এবং তৎকালীন মন্ত্রী এ বিষয়ে অবগতই ছিলেন না। নিয়োগপ্রাপ্ত ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় নিয়োগ বাতিল করতে হয়। মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, মন্ত্রীকে না জানিয়েই এমন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ হয়েছিল, যা সাধারণত মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।
একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন ও বদলিতেও শাহে আলমের প্রভাব নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এমনই একটি ঘটনায় জুলাই মাসে চট্টগ্রামের এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান তিনি, এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব মন্তব্য করেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবারের সদস্যদের সরকারি কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার কঠোর চর্চা ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদেরও সেই ধারা অনুসরণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজ কার্যালয়ে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, জীবিকার জন্য ব্যবসা করার অধিকার রাজনীতিবিদদেরও আছে, এবং দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি ছেলের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন বলে এটি স্বার্থের দ্বন্দ্বের আওতায় পড়ে না বলে তিনি মনে করেন। তবে হলফনামার মাধ্যমে দায়িত্ব হস্তান্তর করলে প্রকৃত মালিকানারও পরিবর্তন হয় কি না— এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব তিনি দেননি।
বিসিক পরিচালক থাকাকালে পরিবারের প্রতিষ্ঠানের চুক্তি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বোর্ড সদস্য হিসেবে তাঁর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার কোনো ধাপেই তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে তিনি দাবি করেন। তবে পুলিশ কর্মকর্তা বদলি সংক্রান্ত চিঠি প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

