দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে এসব জেলায় শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে, যেখানে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩১ জন রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন। মেহেরপুরের গাংনী, রংপুরের পীরগাছা এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরেও আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সুন্দরগঞ্জে একটি অনুসন্ধান দল পাঠিয়েছে, যারা প্রাদুর্ভাবের উৎস ও বিস্তারের ধরন খতিয়ে দেখছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামে গত ৯ সেপ্টেম্বর একটি রুগ্ণ গরু জবাই করে মাংস ভাগাভাগি করা হয়। এর পরপরই যারা মাংস কাটাকাটি ও ভাগাভাগিতে অংশ নেন এবং যারা মাংস খেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে জ্বর, ত্বকে ফোসকা ও ঘা দেখা দিতে থাকে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রথমে সাতজন হাসপাতালে আসেন, পরে আরও ১৪ জন যোগ হন এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৩১ জন ভর্তি ছিলেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ গাভিটি জবাইয়ের আগে প্রাণিসম্পদ বিভাগের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। অথচ এর আগেও একই এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় পরিস্থিতি আরও জটিল। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে সেখানে ৪৫ জন, সেপ্টেম্বরে ৩৩ জন এবং অক্টোবরের ১২ তারিখ পর্যন্ত ১৮ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, আক্রান্তরা মূলত রুগ্ণ ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাাড়াচাড়ার কারণে সংক্রমিত হয়েছেন। তাদের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হননি। অন্যদিকে রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৫০ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে অ্যানথ্রাক্স বলে ঘোষণা করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য বিভাগ সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ায় উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় দুই মাস আগে অন্তত ১৫ জন মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের প্রত্যেকেরই রুগ্ণ গরুর মাংসের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস ছিল। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে অ্যানথ্রাক্স, ক্ষুরা ও লাম্পি রোগ প্রতিরোধে কোনো টিকা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খামারিরা বাধ্য হয়ে বাজারে উচ্চমূল্যে টিকা কিনছেন। অথচ সুন্দরগঞ্জের চিত্র আরও উদ্বেগজনক; সেখানে উপজেলায় মোট ২ লাখ ৯১ হাজার ৬০৮টি গবাদিপশুর মধ্যে মাত্র ৮ দশমিক ২ শতাংশকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়া হয়েছে। অথচ রোগ প্রতিরোধে ১০০ শতাংশ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
অ্যানথ্রাক্স একটি প্রাণীবাহিত বা জুনোটিক রোগ। এর জীবাণু Bacillus anthracis মাটিতে থাকতে পারে। গরু-মহিষের মতো তৃণভোজী প্রাণী ঘাস খাওয়ার সময় এই জীবাণু শরীরে নেয়। আক্রান্ত প্রাণীর মাংস কাটাকাটি, নাাড়াচাড়া বা কাঁচা-অর্ধসেদ্ধ মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষ সংক্রমিত হন। তবে মানুষ থেকে মানুষে অ্যানথ্রাক্স ছড়ায় না। মানুষের ক্ষেত্রে এটি মূলত ত্বকে দেখা যায়, তবে গলার ভেতরে ও পাকস্থলীতেও হতে পারে। ত্বকে চুলকানিযুক্ত লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা পরে ফোসকায় পরিণত হয়। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি মারণঘাতী হতে পারে। রংপুরের মিথাপুকুরে আক্রান্ত পশুর মাংস পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে, যা এই রোগের বিস্তারের প্রক্রিয়াটি আরও স্পষ্ট করে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী স্পষ্টভাবে বলেছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে ১০০ শতাংশ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে এবং এই দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। তিনি আরও বলেছেন, আক্রান্ত গবাদিপশু বা অন্য কোনো প্রাণীকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিধিমোতাবেক মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে এবং কেউ যেন আক্রান্ত পশু জবাই বা বিক্রি না করে, সে ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। মিথাপুকুরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আলতাব হোসেনও পরামর্শ দিয়েছেন, আক্রান্ত পশুর মৃতদেহ অন্তত ছয় ফুট মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু চিকিৎসা নয়, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই রোগের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়।
আইইডিসিআর সুন্দরগঞ্জে অনুসন্ধান দল পাঠিয়েছে এবং সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসন মাইকিং ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছে। তবে মাঠপর্যায়ে টিকার ঘাটতি এবং জনবল সংকট সেবা প্রদানে বাধা তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রুগ্ণ পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করলে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

