প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া নিয়ে সংসদে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিলটির বিরুদ্ধে বারবার আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং ইতিমধ্যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করেছে। দলটির সংসদীয় দলের একজন মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিল পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই তাঁরা অংশ নেবেন না।
অন্যদিকে সরকারপক্ষের দাবি, আগের অধ্যাদেশের চেয়ে নতুন খসড়ায় শাস্তির বিধান আরও কঠোর ও যথাযথ করা হয়েছে, তাই বিরোধিতার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তবে তাদের বক্তব্য, বিল সংসদে ওঠার পর আপত্তির জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকলেও জামায়াত সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে রাজি নয়।
গত ২৭ আগস্ট আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জাতীয় সংসদে এই বিল উত্থাপন করেন। পর্যালোচনার জন্য এটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়, যেখানে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। আজ বুধবার বিলটি সংসদে উত্থাপিত হতে পারে বলে সরকারপক্ষের সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত রোববার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপিত হলে জামায়াতের দুই সদস্য বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। এ প্রসঙ্গে দলটির মুখপাত্র জানান, মাত্র দুই কার্যদিবসের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার কারণে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি, যা তাঁদের আপত্তির অন্যতম কারণ।
বিলটিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে জামায়াতের মুখপাত্র বলেন, ২০০৯ সালের মতো এবারও কমিশনকে দুর্বল করে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে কোনো সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলে কমিশন যাতে কার্যকরভাবে প্রতিবাদ করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এর ক্ষমতা সীমিত রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আগের অধ্যাদেশটি বাতিল না করে বরং তাকে আরও শক্তিশালী করে সংশোধন আনা যেত, কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। বিশেষত পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা কার্যত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার লঙ্ঘনেরও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এর জবাবে সরকারদলীয় চিফ হুইপ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, আগের অধ্যাদেশে যে অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের সাজার বিধান ছিল, নতুন খসড়ায় তা বাড়িয়ে দশ বছর করা হয়েছে— এটি দুর্বল করা নাকি শক্তিশালী করা, সে প্রশ্ন তিনি রাখেন। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের উচিত সংসদে দায়িত্বশীলভাবে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করা, শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশনকে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শাস্তি বা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করারও সুযোগ ছিল। কিন্তু নতুন খসড়ায় এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রতিবেদন চাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট না হলে তখন সুপারিশ করতে পারবে, আর সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বা সন্তোষজনক না হলে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে সাধারণ প্রক্রিয়ায় এগোতে পারবে।
একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাও এই পরিবর্তনকে কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা সংকুচিত করার পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এবং তাদের মতে এটি কার্যত ২০০৯ সালের পুরোনো আইনের কাঠামোতেই ফিরে যাওয়ার শামিল।
সমালোচনার পাশাপাশি নতুন খসড়ায় কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বহাল রাখার বিধানও স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে। একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে গঠিত এই কমিশনে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকবেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এসব সদস্যকে মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তত পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, আর মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করে দুই মেয়াদ।
অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রেও নমনীয়তা রাখা হয়েছে— লিখিত, মৌখিক বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে বিনা খরচে অভিযোগ করা যাবে, এমনকি গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতেও কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্তকে প্রকৃত ক্ষতির দ্বিগুণ বা তারও বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এ ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এখন কমিশনের আদেশ মানতে বাধ্য করার বিধান রাখা হয়েছে— কোনো প্রতিষ্ঠান আদেশ অমান্য করলে তার মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক ও তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতেও পৃথক বিধান যুক্ত করা হয়েছে, পাশাপাশি কারাগার, থানা, মানসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসহ ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত হয় এমন স্থান পরিদর্শনের জন্য একটি নতুন প্রতিরোধ ইউনিট গঠনেরও প্রস্তাব রয়েছে নতুন খসড়ায়।
আর্থিক স্বাধীনতার দিক থেকেও কমিশনকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে— নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশি অনুদান গ্রহণের সুযোগসহ নিজস্ব তহবিল পরিচালনার ক্ষমতা রাখা হয়েছে খসড়ায়। পুরোনো ২০০৯ সালের আইন বাতিল হলেও চলমান মামলা ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত একটি প্রশ্নই— শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন সত্যিকার অর্থে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। নতুন খসড়ায় বেশ কিছু নতুন ক্ষমতা যুক্ত হলেও এই একটি জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ও উদ্বেগ থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

