রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা অনির্দিষ্টকাল ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবন কাটাক। তাঁর ভাষায়, সংকটের মূল কারণ যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বড়সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
তারেক রহমান বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুল মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করেও মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে। মায়েরা সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চান, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। আর বয়স্করা নিজেদের ফেলে আসা বাড়িঘর ও গ্রামের স্মৃতি নিয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মানবিক দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ
মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয়শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাখাইন রাজ্যে ফিরে গিয়ে সমাজে পুনঃএকীভূত হতে পারে।
তবে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন রাখার জন্য শিবিরগুলো উপযুক্ত জায়গা নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চাপ শুধু রোহিঙ্গাদের ওপরই পড়ছে না। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বহন করতে হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, এই চাপও বাড়ছে।
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসন, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু রোহিঙ্গা নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশের অমীমাংসিত সংকট দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা একসময় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন ক্রমেই বাড়লেও সংকট মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমছে।
২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই চাহিদা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে। অথচ এই অর্থও কেবল রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, এই প্রবণতা চলতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পাশে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তাদের সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন।
তবে শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে সমস্যাটিকে অনির্দিষ্টকাল ধরে টেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের ওপর এককভাবে এই দায়িত্ব দীর্ঘদিন বহন করার প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
রাখাইনে এখনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা সেখানে জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা দেশে ফেরার বিষয়ে আস্থা ফিরে পায়।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের দিকেও নজর দিতে হবে।
চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।
প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দেখতে চায় না। নিরাপদ পরিবেশে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে তারা যেন মিয়ানমারে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারে—এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশ তাদের ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতায় আটকে না থাকে—এমন প্রত্যাশা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের ভবিষ্যৎ ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।

