জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালি পায়ে বাংলার মাটিতে হেঁটেছেন তিনি। পায়ে জুতা ওঠেনি। কারণ, এই মাটির বুকেই শুয়ে আছে তাঁর প্রিয় সন্তানরা। নিজের সন্তানদের হারানোর শোককে বুকে ধারণ করে জীবনের প্রতিটি দিন তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন একাত্তরের নির্মমতার জীবন্ত স্মারক। তিনি রমা চৌধুরী—‘একাত্তরের জননী’ নামে যিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
কেউ তাঁকে জুতা পরতে বললে বেদনাভরা কণ্ঠে বলতেন, “আমার তিন ছেলে মাটির নিচে। তাদের শরীরের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে আমি হাঁটি কী করে? আমার সন্তানদের কষ্ট হবে না?”
এই একটি বাক্যেই যেন ধারণ হয়ে আছে তাঁর পুরো জীবন , মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, সন্তান হারানোর অসীম বেদনা এবং দেশমাটির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা।
১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের একজন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।
কিন্তু ১৯৭১ সাল তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন রমা চৌধুরী। ১৩ মে তাঁকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি বাড়ির পাশের পুকুরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তা মেলেনি। হানাদার বাহিনী গানপাউডার দিয়ে তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাঁর ঘর, সম্পদ এবং বহুদিনের শ্রমে গড়ে তোলা মূল্যবান সাহিত্যকর্ম ও কাগজপত্র। নিজের সৃষ্টিশীল জীবনের অমূল্য স্মৃতিগুলো আগুনে পুড়ে যেতে দেখেও সেগুলো রক্ষা করার মতো কোনো সুযোগ তাঁর ছিল না।
এরপর শুরু হয় আরও কঠিন এক জীবনসংগ্রাম। বৃদ্ধা মা ও সন্তানদের নিয়ে কখনো বন-জঙ্গলে, কখনো ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির আশপাশে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় কাটাতে হয় তাঁকে। মাথার ওপর কখনো খড়কুটো, কখনো পলিথিন এভাবেই কেটেছে একাত্তরের অসংখ্য রাত।
যুদ্ধের ভয়াবহতা থেমেছিল একদিন। কিন্তু রমা চৌধুরীর জীবনে যুদ্ধের ক্ষত কখনো থামেনি।
স্বাধীনতার পর সন্তান হারানোর শোক, দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি লেখালেখিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন। তাঁর জীবনের একাত্তরের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে কালজয়ী গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’-তে।
লেখালেখি করেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন দীর্ঘদিন। শুরুতে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখে সম্মানীর বদলে পেতেন পত্রিকার ৫০টি কপি। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর সংসার। পরবর্তীতে নিজের লেখা বই নিজেই প্রকাশ করে বই হাতে ফেরি করে বিক্রি করেছেন। সাহিত্যকে তিনি শুধু সৃষ্টির মাধ্যম নয়, জীবনধারণের অবলম্বন হিসেবেও বেছে নিয়েছিলেন।
প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে তাঁর জীবনই – যে জীবন একাত্তরের নির্যাতন, সন্তান হারানোর শোক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রমা চৌধুরী।
তাঁর মৃত্যুতে থেমে যায় একটি জীবন। কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি তাঁর গল্প।
খালি পায়ে বাংলার পথে হাঁটা সেই নারী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়গাথা নয়; এর ভেতরে মিশে আছে অসংখ্য মায়ের কান্না, নির্যাতিত নারীর যন্ত্রণা, সন্তান হারানো পিতামাতার নিঃশব্দ শোক এবং অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ।
রমা চৌধুরী সেই ইতিহাসেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীর প্রয়াণবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল অন্তর্লীন ভালোবাসা।

