বাজেটে দেওয়া সুবিধা তিন মাসের মাথায় ফিরিয়ে নিল সরকার। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ বাতিল হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। রাজস্ব আদায় কমে যাওয়াই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সূত্র। ব্যবসায়ী নেতারা এতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-সংক্রান্ত সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে। নতুন বিধানে প্রতিটি কর মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন দিতে হবে। আগের ব্যবস্থায় তিনটি কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১৫ দিন সময় মিলত। ফলে রিটার্ন দেওয়ার সময়সীমা কার্যত তিন মাস থেকে এক মাসে নেমে এসেছে।
এনবিআর সূত্র বলছে, ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছিল রাজস্ব আদায়ে। বোর্ড এ বিষয়ে সরকারকে চিঠি দেয়। সেই চিঠির পর পর্যালোচনা করে আগের ব্যবস্থায় ফেরার সিদ্ধান্ত হয়। বোর্ডের ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে আগের মতোই প্রতি মাসে রিটার্ন ও পরিশোধযোগ্য ভ্যাট জমা দিতে হবে। তাঁর ভাষ্য, তিন মাস পরপর রিটার্নের কারণে ভ্যাট আদায়ের গতি ধীর হয়ে গিয়েছিল।
বোর্ডের হিসাবে এর প্রমাণও মিলেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। দুই মাসে পাঁচ ভাগের এক ভাগ আদায় কমে যাওয়া রাজস্ব প্রশাসনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। বিশেষ করে বছরের শুরুতেই যদি আদায়ের গতি এভাবে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে যায়।
তবে এই পতন কতটা প্রকৃত ক্ষতি, আর কতটা সময়ের হেরফের, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা মাসে মাসে ভ্যাট জমা দেন না, তিন মাস শেষে একসঙ্গে দেন। ফলে প্রথম দুই মাসে সরকারি কোষাগারে জমা কম দেখানো স্বাভাবিক। এর মানে জুলাই-আগস্টের পতন আংশিকভাবে হিসাবের সময়সূচির ফল হতে পারে। সেপ্টেম্বরে তিন মাসের ভ্যাট একসঙ্গে জমা পড়লে চিত্র কিছুটা বদলাতে পারে। অন্য এক গবেষণা সংস্থাও সিগারেট খাতের রাজস্ব কমার তথ্য নিয়ে একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছিল। তারা বলেছিল, নতুন ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার কারণে রাজস্ব কখন হিসাবে উঠছে, তাতে প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ ২০ শতাংশ কমার পুরোটাই কর ফাঁকি বা আদায়ে ব্যর্থতা, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে সরকারের হাতে নগদ প্রবাহ কমে যাওয়া নিজেই একটি সমস্যা। সরকারি ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসেই অর্থের প্রয়োজন হয়, তিন মাস পরের অপেক্ষায় তা চলে না।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের ভিত্তিও কম নয়। বাজেটে ত্রৈমাসিক সুবিধা দেওয়ায় তাঁরা একে ব্যবসা সহজ করার ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তাঁদের হিসাবে এতে ব্যবসা চালানোর খরচও কমত। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি মাসে রিটার্ন দেওয়া ঝামেলার। কাগজপত্র গোছানো ও ভ্যাট কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। ছোট প্রতিষ্ঠানে আলাদা হিসাবরক্ষক থাকে না। মালিক বা এক-দুজন কর্মীকেই এসব সামলাতে হয়। ফলে প্রতি মাসে এই কাজ মানে মূল ব্যবসা থেকে সময় সরে যাওয়া। ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় তাঁরা প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় পেতেন, ভুলের ঝুঁকিও কমত।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ সিদ্ধান্তটিকে ব্যবসায়ী সমাজকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত হতাশাজনক বলেছেন। টিবিএসকে তিনি এটিকে পশ্চাৎমুখী ও অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ আখ্যা দেন। তাঁর মতে, এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়মপালনের চাপ, প্রশাসনিক খরচ ও পরিচালনার ঝামেলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, নীতিতে এমন অসামঞ্জস্য ব্যবসায়ীদের আস্থা নষ্ট করে এবং ব্যবসার পরিবেশ আরও কঠিন ও অনিশ্চিত করে তোলে। তিনি সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ত্রৈমাসিক রিটার্নের আগের প্রতিশ্রুতি বহাল রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন।
এই ঘটনার একটি বড় শিক্ষা নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে। বাজেটে ঘোষিত সুবিধা চালুর তিন মাসের মধ্যেই প্রত্যাহার করা হলো। বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা সাধারণত পরিকল্পনা করার আগে নীতির স্থিতিশীলতা দেখেন। বারবার নিয়ম বদলালে তাঁরা ঝুঁকি বেশি ধরেন। ফলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে দ্বিধা তৈরি হয়। সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন যেমন বাস্তব, ব্যবসায়ীদের আস্থা ধরে রাখাও তেমনই জরুরি। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কোনো পক্ষেরই স্থায়ী লাভ হয় না।
সামনে একটি মধ্যপন্থা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যেমন বড় ও মাঝারি করদাতাদের জন্য মাসিক রিটার্ন বহাল রেখে ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট বার্ষিক লেনদেনের সীমার নিচে ত্রৈমাসিক সুবিধা রাখা। এতে রাজস্বের বড় অংশ নিয়মিত আসবে, আবার ছোট উদ্যোক্তারাও স্বস্তি পাবেন। প্রতিবেদনে অবশ্য সরকার বা বোর্ডের পক্ষ থেকে এমন কোনো বিকল্পের কথা বলা হয়নি। তাই এটি নিছক একটি সম্ভাব্য পথ।
এখন নজর থাকবে দুটি বিষয়ে। প্রথমত, মাসিক ব্যবস্থায় ফেরার পর পরবর্তী কয়েক মাসে আদায় কতটা বাড়ে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর চাপে সরকার নতুন করে কোনো ছাড় বা বিকল্প দেয় কি না। এই দুটির উত্তরেই বোঝা যাবে, রাজস্ব আদায় আর ব্যবসা সহজীকরণের মধ্যে সরকার কোন দিকে ঝুঁকছে।

