বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পাশে নির্মিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের ‘অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কনডাক্ট’ (ওআরবিসি)-এ এই অভিযোগটি জমা দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের সহায়তায় বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল, সুন্দরবন এলাকার কৃষক ও ভারতীয় জনপ্রতিনিধি অনিমেষ মণ্ডল এবং পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবী সংগঠন ‘দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’ এই অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে বার্কলেস। পরিবেশগত ও মানবাধিকার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের আগে ব্যাংকটি প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেনি।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্প’ নামে পরিচিত এই ১,৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের কক্সবাজারের রামপালে সুন্দরবনের অতি নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালের মার্চে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় থেকেই এই প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা ছিল। ইউনেসকোও প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছিল। পরিবেশ, সামাজিক প্রভাব ও সুশাসন (ইএসজি) নীতির কথা বিবেচনা করে আরও কয়েকটি ব্যাংক প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
বার্কলেস ব্যাংক সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন করেনি। তবে অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা সুন্দরবনের পাশে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ছিল। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসির ১৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরো মূল্যের শেয়ার ও বন্ড আন্ডাররাইট করে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আবারও তারা এনটিপিসির ৬৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের শেয়ার ও বন্ডের অর্থায়নে সহায়তা করে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বার্কলেস ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যু আন্ডাররাইট করে। এই ব্যাংকই পরবর্তীতে রামপাল প্রকল্পে ১.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ দেয়।
সুন্দরবন কেবল ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশই নয়, এটি দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে। অভিযোগকারী পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এর আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে ভারী ধাতুর দূষণ আন্তঃসংযুক্ত নদী ও খালের মাধ্যমে প্রবেশ করছে সুন্দরবনে। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবনের পানি ও পলির নমুনায় পারদ ও আর্সেনিকের উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে, যার সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল পশুর নদে। গবেষকেরা ভারী ধাতুর দূষণের উৎস হিসেবে শিল্পবর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও ‘উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেছেন, ‘সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতি সংকটের প্রথম সারিতে রয়েছে। আমরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই যে তারা যেন এই সংকটে অবদান রাখছে—এমন তেল ও কয়লা উন্নয়নে অর্থায়ন করার আগে আবার ভাবে’। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের ব্যাংকগুলোকে তাদের কার্বন নিঃসরণকারী বিনিয়োগের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনার এটি একটি বড় সুযোগ।
অভিযোগকারী শরীফ জামিল বলেছেন, ‘বার্কলেসের মতো ব্রিটিশ ব্যাংকগুলো সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের পাশে উচ্চ-নির্গমনকারী এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নের মাধ্যমে জলবায়ু ক্ষতিতে অবদান রাখছে। আমি এই অভিযোগ এনেছি তাদের ওইসিডি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে আনতে, যাতে তাদের বিনিয়োগ থেকে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করা যায়’।
ওআরবিসি অন্তর্ভুক্ত জাতীয় যোগাযোগ কেন্দ্র (এনসিপি) অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করবে। গৃহীত হলে তারা মধ্যস্থতা বা আরও তদন্ত করতে পারে, তবে তাদের কোনো বাধ্যতামূলক ক্ষমতা নেই।

