তথ্য চেয়ে না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে নাগরিকেরা দরজায় কড়া নাড়ছেন, কিন্তু শুনানির মতো কেউ নেই। তথ্য কমিশনে কোনো কমিশনার না থাকায় সাড়ে ৮০০ অভিযোগের একটিরও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় কমিশন এর আগে কখনো অচল থাকেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসে এই বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে জমে থাকা অভিযোগের সংখ্যা সাড়ে ৮০০। গত জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৭৮০। অর্থাৎ কয়েক মাসেই অভিযোগ বেড়েছে, কিন্তু শুনানি ও নিষ্পত্তির কাজ থমকে আছে। কমিশন এখন কেবল রুটিন প্রশাসনিক কাজেই সীমাবদ্ধ।
কমিশনার না থাকায় কেবল অভিযোগের শুনানিই বন্ধ নেই। তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রকাশনার কাজও প্রায় থেমে গেছে। ছোটখাটো নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে না।
২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য নাগরিকেরা চাইতে পারেন। এই আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব তথ্য কমিশনের। তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করা এবং কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনাই প্রতিষ্ঠানটির কাজ।
কেউ তথ্য চেয়ে নির্দিষ্ট সময়ে না পেলে কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। একইভাবে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পেলে কিংবা আবেদনে সন্তোষজনক সাড়া না মিললেও অভিযোগের সুযোগ আছে।
অভিযোগ পেলে কমিশন অনুসন্ধান ও শুনানি করতে পারে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, জরিমানা করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের আছে। এই ক্ষমতা না থাকলে আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। এখন কার্যত সেই ঝুঁকিই দেখা দিয়েছে।
দুই বছর ধরে শূন্য আসন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তখনকার প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক এবং তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম একই বছরের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। পরে আরেক কমিশনার মাসুদা ভাট্টিকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুই বছরেও নতুন কোনো কমিশনার নিয়োগ হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠন করেনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাত মাসের বেশি সময় পার হয়েছে, তবু এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
গত ৯ জুলাই প্রধান তথ্য কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি শূন্য পদের জন্য কমিটি দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেবেন।
কিন্তু কমিটি গঠনের আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সামান্য। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কমিটি আবেদন আহ্বান করে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে এবং এখন যাচাই-বাছাই চলছে। তাঁর আশা, শিগগিরই কমিশন গঠন সম্ভব হবে।
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, এক মাসের মধ্যে স্বাধীন তথ্য কমিশন গঠন করা হবে। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে, অথচ কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে গতকাল যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ান-উল-আলমের মতে, দীর্ঘদিন কমিশন কার্যকর না থাকায় শুধু নাগরিকেরাই সমস্যায় পড়ছেন না। তথ্য অধিকার–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’। তথ্য কমিশনেও এ উপলক্ষে আলোচনা সভা হওয়ার কথা।
তবে প্রতিপাদ্য যেখানে অপতথ্য ঠেকাতে সঠিক তথ্যপ্রাপ্তির ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে সঠিক তথ্য আদায়ের প্রধান প্রতিষ্ঠানটিই কার্যত অচল। অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাগরিকের হাতে থাকা প্রধান আইনি হাতিয়ার এভাবে অকার্যকর থাকলে সেই লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মূল প্রশ্ন সময়। বাছাই কমিটির কাজ কত দ্রুত শেষ হয় এবং রাষ্ট্রপতি কবে নিয়োগ দেন, তার ওপর নির্ভর করছে সাড়ে ৮০০ অভিযোগের ভবিষ্যৎ। ততদিন তথ্য না পাওয়া নাগরিকদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

