“কেবল জিন্দাবাদ স্লোগানে আগামীর প্রজন্মকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা যাবে না, প্রয়োজন জ্ঞানের বিকাশ” – আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের এই বক্তব্যটি রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আঘাত করেছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা-২০২৬’-এর আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
কথাটা শুনতে যতটা সাধারণ, রাজনৈতিকভাবে এর তাৎপর্য তার চেয়ে অনেক বেশি।
কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে – যোগ্যতার চেয়ে স্লোগান, চিন্তার চেয়ে মিছিল, দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য এবং কাজের চেয়ে পরিচয় বড়।
কে কতটা পড়েছেন, কী জানেন, কী করতে পারেন সেটি যেন অনেক পরের বিষয়। প্রথম জিজ্ঞাসা হলো, আপনি কার লোক? কোন স্লোগান দেন? কোন নেতার ছবি প্রোফাইলে রাখেন? কয়টা মিছিল করেছেন?
এভাবে একটি রাষ্ট্র মেধাবী নাগরিক তৈরি করতে পারে না। তৈরি করতে পারে শুধু স্লোগানবাজ কর্মী। আর সেখানেই বিপদ।
রাজনীতি যখন বিনিয়োগের ক্ষেত্র
রাজনীতি মানুষের সেবা করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু যখন রাজনীতি জ্ঞান, দক্ষতা ও জনসেবার জায়গা থেকে সরে গিয়ে পেশা, পদ-পদবি ও ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের শর্টকাটে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি আর সমাজকে নেতৃত্ব দেয় না উপরোন্ত সমাজের ওপর চেপে বসে।
তখন রাজনীতিতে ঢোকার লক্ষ্য হয় জনগণকে দেওয়া নয়, জনগণের কাছ থেকে নেওয়া।
একসময় রাজনীতি ছিল ত্যাগের জায়গা। এখন অনেকের কাছে রাজনীতি হয়ে গেছে বিনিয়োগের জায়গা। আজ সময়, শ্রম ও আনুগত্য বিনিয়োগ করব; কাল পদ পাব, ক্ষমতা পাব, সুযোগ পাব, ঠিকাদারি পাব, নিয়োগে প্রভাব ফেলব, ব্যবসায় সুবিধা পাব।
এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত তৈরি করেছে একটি সুবিধাভোগী ও লুটেরা শ্রেণীর যারা রাষ্ট্রকে নিজেদের প্রাপ্য মনে করে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা ভুলে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত কর্মীরাই
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই ব্যবস্থায় প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
একজন তরুণ বছরের পর বছর দলের জন্য কাজ করেন। মিছিল করেন, মানুষের পাশে দাঁড়ান, মামলা খান, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন সুযোগ আসে, তখন দেখা যায়- যোগ্যতার জায়গায় গোষ্ঠীগত (কোন গ্রুপের) পরিচয়, ত্যাগের জায়গায় তদবির, আর মাঠের কর্মীর জায়গায় সামনে চলে এসেছে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকটি।
ফলে হতাশা জন্ম নেয়। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ রাজনীতি থেকে সরে যান। কেউ বিদেশে চলে যান, কেউ ব্যবসায় চলে যান, কেউ চাকরিতে ঢুকে পড়েন। আর রাজনীতির মাঠে থেকে যান এমন অনেকে, যাদের প্রধান যোগ্যতা দলীয় স্লোগান মুখস্থ এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির মন জুগিয়ে চলা।
রাজনীতি দেশকে কী দেয়?
একজন দক্ষ চিকিৎসক দেশকে চিকিৎসা দেন। একজন আইনজীবী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো তৈরি করেন। একজন শিক্ষক প্রজন্ম তৈরি করেন। একজন বিজ্ঞানী নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন। একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান তৈরি করেন।
আর একজন দক্ষ রাজনীতিক? তিনি রাষ্ট্রের নীতি তৈরি করবেন, অর্থনীতির দিকনির্দেশ দেবেন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের স্বার্থ রক্ষা করবেন।
তাহলে সেই রাজনীতিকের নিজেরই যদি জ্ঞান, দক্ষতা, অর্থনীতি, ইতিহাস, প্রযুক্তি কিংবা বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে ধারণা না থাকে – তিনি দেশকে নেতৃত্ব দেবেন কী দিয়ে?
স্লোগান দিয়ে? না।
স্লোগান দিয়ে নির্বাচন জেতা যেতে পারে; রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। মিছিল দিয়ে জনপ্রিয়তা তৈরি হতে পারে; অর্থনীতি পরিচালনা করা যায় না। নেতার নামে জিন্দাবাদ দেওয়া যায়; একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায় না।
করণীয় পদক্ষেপ
একটি জায়গাতেই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন দরকার।
রাজনীতিতে এমন মানুষ দরকার, যারা শুধু মঞ্চে বক্তৃতা করবেন না- বাজেট বুঝবেন। শুধু দলীয় ইতিহাস জানবেন না – বিশ্ব অর্থনীতি বুঝবেন। শুধু প্রতিপক্ষকে গালি দিতে পারদর্শী হবেন না -বিকল্প নীতিও দিতে পারবেন।
রাজনীতিককে এখন জানতে হবে AI কী, জলবায়ু পরিবর্তন কী, জ্বালানি নিরাপত্তা কী, বৈশ্বিক বাণিজ্য কীভাবে বদলাচ্ছে, কর্মসংস্থান কোথায় তৈরি হবে, বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কী, কৃষি কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হবে, শিক্ষা কীভাবে বদলাবে।
কারণ পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি এখনো আটকে থাকি “অমুক ভাই জিন্দাবাদ, তমুক ভাই জিন্দাবাদ”-এ, তাহলে পৃথিবী আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।
পেশা হিসেবে রাজনীতি: একটি প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতিকে পেশা বানানোর সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার।
রাজনীতি অবশ্যই পূর্ণকালীন দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু রাজনীতি যদি কারও একমাত্র জীবিকা হয়ে যায় এবং জনগণের সেবা নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতাই যদি তার আয়ের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য।
যে ব্যক্তি রাজনীতিতে এসে কিছু দিতে চায়, সে জিজ্ঞেস করবে আমি কী করতে পারি? আর যে ব্যক্তি রাজনীতিকে পেশা বানিয়েছে, সে জিজ্ঞেস করবে আমি কী পেতে পারি?
এই দুই ভাবনার পার্থক্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
দলগুলোর জন্য আয়না
তাই এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের আয়নায় দেখার।
কর্মী বাছাইয়ে স্লোগান নয়, যোগ্যতা চাই। নেতৃত্বে আনুগত্য নয়, দক্ষতা চাই। মনোনয়নে পকেট নয়, জনসম্পৃক্ততা চাই। রাজনীতিতে পেশাদার সুবিধাভোগী নয়, পেশাদার জনসেবক চাই।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই – তিনি স্লোগানের বিপরীতে জ্ঞানের বিকাশের কথা বলেছেন। এই কথাটি শুধু একটি দলের জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য।
কারণ বাংলাদেশের সামনে এখন আর শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো সামনে ক্ষমতায় গিয়ে কী করা হবে? দেশকে কোথায় নেওয়া হবে? আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যাওয়া হবে?
সেই বাংলাদেশে মিছিল থাকবে, কিন্তু মিছিলই রাজনীতির মাপকাঠি হবে না। স্লোগান থাকবে, কিন্তু স্লোগান যোগ্যতার বিকল্প হবে না। দল থাকবে, মতাদর্শ থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু সবকিছুর ওপরে থাকবে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও জনস্বার্থ।
পরিশেষে বলবো রাজনীতির পুরোনো সমীকরণটি বদলাতেই হবে।
যে রাজনীতি শুধুই নেয়, সেই রাজনীতি দেশের বোঝা। যে রাজনীতি উৎপাদনশীলতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার দিতে জানে, সেটিই রাষ্ট্রের সম্পদ।
আর তাই এখন সত্যিই সময় এসেছে জিন্দাবাদের রাজনীতি থেকে জ্ঞানবাদের রাজনীতিতে যাওয়ার।
মিছিলের রাজনীতি থেকে মেধার রাজনীতিতে যাওয়ার।
পদ পাওয়ার রাজনীতি থেকে দেশ গড়ার রাজনীতিতে যাওয়ার।
কারণ বাংলাদেশের এখন আর শুধু স্লোগান দরকার নেই – দরকার যোগ্য ও মেধাবী মানুষ।

