কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে দেশে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের চাহিদা সামনে আরও বাড়বে। এই বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় সাবমেরিন কেবল খাতে বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার।
নতুন সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম চালু করতে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেছেন, শুধু সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাই নতুন কাঠামো দ্রুত চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে চান।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল খাতের বর্তমান সরকারি-নির্ভর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে দেশের সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার মূল দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি।
সরকার যখন নতুন করে বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা খুলতে যাচ্ছে, তখন দেশের প্রথম বড় বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২২ সালে সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকমকে সাবমেরিন কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের লাইসেন্স দেয় সরকার। শুরুতে প্রতিষ্ঠান তিনটি আলাদা প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও পরে মার্কিন ডলার সংগ্রহের জটিলতার কারণে তারা বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম নামে একটি জোট গঠন করে।
জোটটি কক্সবাজার থেকে একটি শাখা সংযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কমপক্ষে ৪৫ টেরাবাইট প্রতি সেকেন্ড ক্ষমতার একটি বেসরকারি কেবল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়।
প্রকল্পটি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ পেরোলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের জটিলতায় কেবল স্থাপনের কাজ পিছিয়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটিতে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু কেবল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন তখনো মেলেনি।
সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। কেবল স্থাপনে ব্যবহৃত জাহাজের অনুমোদন আটকে থাকায় দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ফলে নতুন নীতির ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নতুন বিনিয়োগকারীরা লাইসেন্স পাওয়ার পর বাস্তবে অবকাঠামো স্থাপন করতে কতটা দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারবেন।
সাবমেরিন কেবল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মেটাকোর সাবকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। তাঁর মতে, এই খাতে প্রতিযোগিতা বাড়লে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি দাবি করেন, বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে ইন্টারনেটের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহারে বিলম্ব বা ল্যাটেন্সিও কমবে। এতে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আমিনুল হাকিমের মতে, সাবমেরিন কেবল অপারেটরদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো সাবমেরিন কেবল কোম্পানি নয়, বরং ভারতের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ আনা আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল কেবল সংযোগ।
বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থায় বৈচিত্র্যের ঘাটতিকেও তিনি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে প্রায় ২০টি, মালয়েশিয়ার ২৪টি, থাইল্যান্ডের ১২টি এবং সিঙ্গাপুরের ৩০টি সাবমেরিন কেবল সংযোগ রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র দুটি সরকারি সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা চালু আছে।
শিগগিরই এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৬ চালু হলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডউইথ সুবিধা পাবে। তবে এতে ভবিষ্যতের সব চাহিদা মিটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৪ ২০৩০ সালের দিকে তার কার্যক্ষমতার শেষ পর্যায়ের দিকে যেতে পারে।
আমিনুল হাকিম দ্রুত বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, দেরি হলে ২০২৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশ প্রায় ২০ টেরাবাইট প্রতি সেকেন্ড ব্যান্ডউইথ ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।
রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, নতুন নীতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে দেশের প্রকৃত সংযোগ চাহিদাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, সাবমেরিন কেবল কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয় নয়; এটি মূলত দেশের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও চাহিদা পূরণের বিষয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এখন একটির বেশি সাবমেরিন কেবল প্রয়োজন এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিধিনিষেধ রাখতে চান না।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। গুগল বা মেটার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাংলাদেশে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের আগ্রহ দেখালে তাদের অনুমতি দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্ন তুলে উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের সরাসরি সংযোগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিকের কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৪ ও এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৫ নামে দুটি সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। দুটিরই সক্ষমতা কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয় ব্যবস্থা এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৬ চালু হলে প্রায় ৩০ টেরাবাইট প্রতি সেকেন্ড অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা শুধু বর্তমান চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ নয়। রেহান আসিফ আসাদের মতে, ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ এআই ও ডেটা সেন্টারভিত্তিক বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৫০ টেরাবাইট প্রতি সেকেন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে চায়, তাহলে দেশের সাবমেরিন কেবল সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড সেবা, উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং এবং বড় ডেটা সেন্টারের জন্য শুধু বিপুল ব্যান্ডউইথই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুতগতির ও কম বিলম্বের সংযোগ, একাধিক সাবমেরিন কেবল পথ, বিকল্প ল্যান্ডিং স্টেশন, শক্তিশালী দেশীয় ফাইবার নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নিরপেক্ষ ডেটা সেন্টার এবং স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক সংযোগ।
নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো কার্যকর হলে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল খাত সরকারি-নির্ভর মডেল থেকে ধীরে ধীরে বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিণত হতে পারে। এতে দেশীয় বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক কেবল অপারেটর—সবাই অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে শুধু লাইসেন্স দেওয়াই যথেষ্ট হবে না। বিনিয়োগকারীরা যাতে অনুমোদন পাওয়ার পর বাস্তবে অবকাঠামো স্থাপন করতে পারেন, সে জন্য দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টারনির্ভর অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশ এগোতে চাইলে ভবিষ্যতের চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সংযোগ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। সরকারের বর্তমান উদ্যোগের মূল লক্ষ্যও সেটিই—চাহিদা বাড়ার পর সংকট মোকাবিলা নয়, বরং সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সক্ষমতা তৈরি করা।

