কক্সবাজারে সাম্প্রতিক এক অভিযানে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম উদ্ধারের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের নতুন আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে?
গত ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনা নাগরিক এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক। অভিযানে প্রায় ২ হাজার আইফোন, কয়েক ডজন ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং অনলাইনে বিপুলসংখ্যক ভুয়া পরিচয় পরিচালনার জন্য তৈরি একটি বিশেষ ব্যবস্থা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন, যাদের বেশিরভাগই চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক, পালিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু কক্সবাজারের একটি অপরাধ তদন্তের বিষয় নয়, বরং এটি বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশেও কি আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের একটি নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে?
এখনই বাংলাদেশকে কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের মতো বড় সাইবার প্রতারণার কেন্দ্র বলা যাবে না। তবে কক্সবাজারের ঘটনাটি একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে। কারণ এ ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্ক একবার শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কক্সবাজারের ঘটনায় দেখা গেছে, বড় ধরনের অপরাধী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সবসময় বিশেষ কোনো দুর্গ বা গোপন স্থাপনার প্রয়োজন হয় না। সাধারণ হোটেল, রিসোর্ট বা ভাড়া করা ভবন ব্যবহার করেও এমন কার্যক্রম চালানো সম্ভব।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকার একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে একটি বড় কম্পিউটার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। সেখানে ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, প্রায় ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কিবোর্ড, কয়েকটি ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও অন্যান্য সরঞ্জাম।
রিসোর্টের একটি হলরুমকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল। পাশাপাশি কয়েকটি শব্দনিরোধক কক্ষও পাওয়া যায়।
পুলিশ প্রথমে অনলাইন জুয়ার বিষয়টি সন্দেহ করলেও পরে তদন্তে বিনিয়োগ প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। ভুয়া বাজার বিশ্লেষণ, মিথ্যা বিনিয়োগের প্রস্তাব, নকল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এবং গ্রাহকের টাকা নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার মতো প্রতারণার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রতারণা বর্তমানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিচিত একটি পদ্ধতি। প্রতারকরা প্রথমে মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করে, এরপর ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে।
মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও আরও কয়েকটি দেশে অনলাইন প্রতারণা চক্র এখন বড় অপরাধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, অর্থপাচার এবং সংগঠিত অপরাধ যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার পর এসব চক্র নতুন নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। এক জায়গায় অভিযান শুরু হলে তারা অন্য দেশে ঘাঁটি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের কিছু দুর্বলতা এমন অপরাধী নেটওয়ার্কের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি নাগরিকদের চলাচল নজরদারির সীমাবদ্ধতা, ভাড়া করা বাড়ি ও হোটেল ব্যবস্থাপনায় দুর্বল তদারকি এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সীমিত সক্ষমতা।
প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে বিদেশি প্রতারকরা বাংলাদেশে এসেছে কি না। বরং বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে কি এমন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে তারা দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে?
কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট ও ভাড়া করা স্থাপনা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে বিদেশিদের আনাগোনাও বেশি। এসব কারণে অপরাধী চক্র সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে।
উখিয়াসহ আশপাশের এলাকায় আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের পাচার ও অবৈধ কার্যক্রমের ঝুঁকি রয়েছে। যদিও বর্তমান সাইবার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে এসব নেটওয়ার্কের সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি, তবে দুর্বল নজরদারি ও সীমিত আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা অপরাধীদের সুযোগ দিতে পারে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের ঘটনার আগেও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় চীনা নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতায় অনলাইন প্রতারণা, অবৈধ ভিওআইপি ও অনলাইন জুয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
এসব ঘটনার সঙ্গে কক্সবাজারের নেটওয়ার্কের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তবে এগুলো দেখায় যে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের জড়িত কিছু সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যক্রমের উপস্থিতি রয়েছে।কক্সবাজারের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পালিয়ে যাওয়া শত শত মানুষ কারা ছিল?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে দেখা গেছে, প্রতারণা চক্রের আস্তানায় পাওয়া অনেক মানুষ নিজেরাও পাচারের শিকার। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিয়ে গিয়ে জোর করে অপরাধে যুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের ঘটনায় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা সবাই অপরাধী ছিল, নাকি কেউ কেউ প্রতারণার শিকার হয়েছিল।
এ ছাড়া আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। কারা তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিল? কে সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল? স্থানীয়ভাবে কারা সহযোগিতা করেছে? বাড়ির মালিক বা কর্মচারীরা বিষয়টি জানতেন কি না?এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বড় কোনো নেটওয়ার্কের অংশ।
বাংলাদেশ এখনো এমন পর্যায়ে যায়নি, যেখানে দেশকে এশিয়ার নতুন প্রতারণা কেন্দ্র বলা যায়। কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের মতো বড় আকারের অপরাধী ঘাঁটিও এখানে তৈরি হয়নি।
তবে আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের ধরন বদলে যাচ্ছে। এখন বড় বড় সুরক্ষিত স্থাপনার পরিবর্তে ছোট ছোট হোটেল, বাসা ও অফিস ব্যবহার করেও এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।তাই কক্সবাজারের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এখনই বিদেশি নাগরিকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সাইবার অপরাধ তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সহযোগী নেটওয়ার্ক শনাক্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
কারণ অপরাধী নেটওয়ার্ক যখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন তা ভাঙা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

