দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে একটি বেসরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চীনা একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের বদলে তাদের সঙ্গে আগে হওয়া চুক্তি অব্যাহত রাখলে রাষ্ট্রের প্রায় ১১০ কোটি ডলার সাশ্রয় হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য দেশের তৃতীয় ভাসমান সংরক্ষণাগার ও পুনঃবাষ্পীকরণ ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্যে আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। তবে সেই চুক্তি বাতিল করে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুনভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই মূলত আপত্তি জানিয়েছে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় সংস্থার চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মার্চে স্বাক্ষরিত মূল চুক্তি অনুযায়ী পনেরো বছর পরিচালনার পর ভাসমান টার্মিনাল, নোঙর ব্যবস্থা ও সমুদ্রতলের পাইপলাইন কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে—একটি এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, অন্যটি একটি মার্কিন কোম্পানির মালিকানায়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তৃতীয় আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হস্তান্তরের আগে সম্পূর্ণ ডক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি শ্রেণিবিন্যাসকারী সংস্থার মাধ্যমে সনদায়ন সম্পন্ন করা হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে স্থাপনাটি আরও এক দশক নিরাপদে চালানো সম্ভব।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার একাধিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে। এই লক্ষ্যে গত জুলাই মাসে সরকার-থেকে-সরকার পদ্ধতিতে একটি চীনা প্রকৌশল ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্তে সম্মতি দেয় অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি। এর আগে জুন মাসে চীনা প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল বলে জানা যায়।
চিঠিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটি নির্মাণ-মালিকানা-পরিচালনা-হস্তান্তর পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, যেখানে পনেরো বছরের পরিচালনা শেষে পুরো অবকাঠামো বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় সংস্থার মালিকানায় চলে যাবে। কিন্তু চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত কাঠামোয় শুধু নির্মাণ-মালিকানা-পরিচালনা পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানে মেয়াদ শেষেও স্থাপনার মালিকানা রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতে আসবে না। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে প্রায় আটাশি কোটি ত্রিশ লাখ ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য উদ্ধৃত করে চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত টার্মিনালের দৈনিক ভাড়া হবে প্রায় তিন লাখ বিয়াল্লিশ হাজার ডলার, যেখানে বিদ্যমান চুক্তির আওতাধীন টার্মিনালের ভাড়া প্রায় তিন লাখ ডলার। এই হিসাবে পুরনো চুক্তি বহাল রাখলে প্রতিদিন প্রায় বিয়াল্লিশ হাজার ডলার সাশ্রয় হবে, যা পনেরো বছরে দাঁড়াবে প্রায় তেইশ কোটি ডলারে।
মালিকানা হস্তান্তরজনিত আর্থিক সুবিধা এবং তুলনামূলক কম ভাড়া—এই দুই মিলিয়ে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় একশ দশ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে হিসাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিঠিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতির দিক থেকেও তাদের প্রকল্প এগিয়ে আছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে দুই কোটি ডলারের বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি খাতের এই বিতর্ক দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে খরচ সাশ্রয়ের যুক্তি, অন্যদিকে নতুন প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী দিনে সরকার এই বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তা নিয়ে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

