জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সভাপতিত্ব হবে সবার জন্য উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংলাপ, সহযোগিতা এবং যেখানে সম্ভব অভিন্ন অবস্থান খুঁজে বের করাকে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও সামগ্রিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নজিরবিহীন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নতুন প্রযুক্তির বিকাশ নতুন কিছু সুযোগও তৈরি করেছে।
১৯৮৫ সালে প্রথমবার জাতিসংঘে প্রতিনিধি হিসেবে আসা খলিলুর রহমান বলেন, তাঁর মেয়াদে সংলাপ ও সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সব বিরোধ দ্রুত বা সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধান হবে—এমনটা তিনি মনে করেন না। তবে মতপার্থক্য থাকলেও যেখানে সম্ভব অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা ও পারস্পরিক যোগাযোগ তাঁর কাজের ধরন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘জাতিসংঘ সদস্যরাষ্ট্রগুলোর চেয়েও বড়’
জাতিসংঘ সনদের শুরুতে থাকা ‘আমরা, জাতিসংঘের জনগণ’ কথাটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘকে শুধু সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও উন্মুক্ত করে তোলার বিষয়টি তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম লক্ষ্য হবে।
রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জাতিসংঘে তাদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করার সময় শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছে এবং জাতিসংঘে তাদের কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তিনি এই কাজ চালিয়ে যাবেন।
‘ভবিষ্যতের জন্য জাতিসংঘকে প্রস্তুত করতে হবে’
খলিলুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারের মূল বক্তব্য ছিল ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা’। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তোলাকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাঁর মতে, এমন একটি জাতিসংঘ দরকার যেখানে দেশগুলো আস্থা ও আগ্রহের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে অবস্থান নিতে ও ভোট দিতে পারে।
জাতিসংঘের সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি শুধু নামমাত্র বা বাহ্যিক পরিবর্তনের বদলে অর্থবহ সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, জাতিসংঘের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গভীর পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ১৯৪৫ সালের মতো নেই। এটি জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ, তাই বিশ্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘকেও পরিবর্তিত হতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, তাঁর সভাপতিত্বেও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
‘আমি সব দেশের প্রেসিডেন্ট’
নিজের নির্বাচনে যারা তাঁকে সমর্থন করেছে বা করেনি—সব দেশের জন্যই সমানভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারের সময়ই তিনি জানিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে ভোট দেওয়া-না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সব দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর অবস্থান একই রয়েছে।
জাতিসংঘ সনদ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া ম্যান্ডেট তাঁর দায়িত্ব পালনের মূল ভিত্তি হবে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংলাপের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হলে তাঁর দায়িত্ব পালনও সহজ হবে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের ক্ষেত্রেও চলমান প্রক্রিয়াকে সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। তবে এখানেও তিনি অর্থবহ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
জাতিসংঘে প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা—দুই ভূমিকাতেই দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, সংগঠনটিকে তিনি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
নতুন মহাসচিব নির্বাচনেও থাকবে ভূমিকা
পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সনদে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন বলে জানান খলিলুর রহমান।
সনদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থী সুপারিশ করে এবং সাধারণ পরিষদ তাঁকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়।
খলিলুর রহমান বলেন, দ্রুত একজন প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে তিনি সদস্যরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন। তাঁর মতে, জাতিসংঘের নেতৃত্বে যেন কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি না হয় এবং ক্ষমতা হস্তান্তর কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য দ্রুত প্রক্রিয়াটি শেষ করা প্রয়োজন।
এআই নিয়েও জাতিসংঘের ভূমিকা চান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ নিয়েও কথা বলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি। এআই পরিচালনা ও এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
আগামী উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে অংশ নিতে যাওয়া বিশ্বনেতাদের উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ ও মানবাধিকারের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার নতুন করে তুলে ধরার আহ্বান জানাবেন বলেও জানান তিনি।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্য থেকে অভিন্ন স্বার্থ ও সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে একটি অভিন্ন কর্মসূচি তৈরির চেষ্টা করবেন বলে জানান খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। শপথে তিনি নিষ্ঠা, বিচক্ষণতা ও বিবেকের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের এবং শুধু জাতিসংঘের স্বার্থকে সামনে রাখার অঙ্গীকার করেন।
জাতিসংঘ সনদ ও সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধি মেনে চলার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সরকার বা বাইরের কোনো পক্ষের কাছ থেকে নির্দেশনা গ্রহণ বা তা মেনে চলবেন না বলেও শপথ নেন তিনি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের কথোপকথনেও নিজের উন্মুক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, তাঁর দরজা সবসময় খোলা থাকবে এবং সাংবাদিকদেরও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার আহ্বান জানান।
তিনি তাঁর পূর্বসূরির প্রশংসা করে বলেন, কঠিন একটি সাধারণ পরিষদ অধিবেশনকে তিনি সফলভাবে পরিচালনা করেছেন।

