কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের খোঁজে বাংলাদেশীদের অনিয়মিত অভিবাসনের গন্তব্য এখন আর শুধু পশ্চিমা বিশ্বে সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে আফ্রিকার নানা দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা চেয়ে আবেদন করেছেন ষাট হাজারের বেশি বাংলাদেশী নাগরিক—একটি সংখ্যা যা এতদিন মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা এই প্রবণতার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিক উন্মোচন করেছে।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদার জন্য আবেদন করা বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ষাট হাজার। এর মধ্যে মাত্র আটশ পঞ্চাশ জনের আবেদন শরণার্থী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, বাকি প্রায় ঊনষাট হাজার সাতশ জনের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন অথবা অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
এই আশ্রয়প্রার্থীদের সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত হয়েছেন আফ্রিকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি দেশে, বিশেষ করে যেটি মহাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্র বলে পরিচিত। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে এই দেশে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল সাড়ে চব্বিশ হাজারের কাছাকাছি, যা পরের বছরই কমে নয় হাজার সাতশর ঘরে নেমে আসে। এরপরের তিন বছরে সংখ্যাটি অনেকটা স্থিতিশীল থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে, এবং ২০২৫ সালে তা সাড়ে ছয় হাজারে গিয়ে ঠেকে। একই সময়ে এই দেশে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রতি বছর দুইশর নিচে সীমাবদ্ধ ছিল।
মহাদেশের অন্যান্য অংশে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশে টানা পাঁচ বছর প্রতি বছর হাতে গোনা কয়েকজন বাংলাদেশী শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন, আর দক্ষিণাঞ্চলীয় আরেকটি দেশে কেবল একবারই সামান্য কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি আরও সীমিত—দুই বছরের ব্যবধানে একটি দেশে মোট কয়েক ডজন আবেদন জমা পড়লেও, এই অঞ্চলের কোনো দেশেই বাংলাদেশীদের শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার নজির নেই।
উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বেশি বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থী পাওয়া গেছে একটি দেশে, যেখানে পাঁচ বছরে মোট শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে, যদিও বছরওয়ারি সংখ্যায় ওঠানামা লক্ষ করা গেছে। অঞ্চলের বাকি দেশগুলোতে সংখ্যাটি প্রতি বছর মাত্র কয়েকজনে সীমাবদ্ধ, এবং এখানেও কোথাও শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার তথ্য নেই।
জনশক্তি রফতানি খাত সংশ্লিষ্ট একজন সংগঠক এই পরিসংখ্যানকে বিস্ময়কর বলে বর্ণনা করে জানান, বাংলাদেশী পাসপোর্টের সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি উন্নত দেশে প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে অনেকে তুলনামূলক কম খরচে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশকে বিকল্প রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ প্রথমে আফ্রিকার কোনো দেশে স্থায়ী হয়ে সেখান থেকে পরে উন্নত বিশ্বে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলেন, ইউরোপের অভিবাসন নীতি কঠোর হয়ে ওঠায় বাংলাদেশীদের একটি অংশ অপেক্ষাকৃত অভিবাসীবান্ধব দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। তাঁর মতে, এসব দেশে দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি বা বৈধ অভিবাসীর মর্যাদা পাওয়া গেলে তা ভবিষ্যতে ইউরোপ বা অন্য কোনো উন্নত দেশে প্রবেশের পথ সহজ করে দিতে পারে। তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী গন্তব্য হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা ও স্বজনদের ডেকে নেওয়ার মাধ্যমে একটি টেকসই মাইগ্রেশন-চেইন গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো মূলত ইউরোপে প্রবেশের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে—আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ে সীমাবদ্ধতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশী অভিবাসন-প্রবাহ এখন নতুন নতুন ভৌগোলিক পথ খুঁজে নিচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের অভিবাসন সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের সামগ্রিক জনশক্তি ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসননীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণীয় দিক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

