ছবি ছাড়া বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে করা রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থায় ছবিসহ জাতীয় পরিচয়পত্রই করতে হবে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী বলেন, আদালত রুল খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
মামলাটি দায়ের করেছিলেন রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া আহমাদ মুনা। তিনি নিজেকে শরিয়ত অনুযায়ী পর্দা পালনকারী মুসলিম নারী উল্লেখ করে ছবি ছাড়া বিকল্প পদ্ধতিতে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা চেয়েছিলেন।
ছবি না থাকায় এনআইডি পাননি তিনি
২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেন সুমাইয়া আহমাদ মুনা। আবেদনে তিনি জানান, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ও পর্দানশীন মুসলিম নারী এবং ধর্মীয় বিধান মেনে চলার কারণে কোনো ধরনের ছবি তোলেন না।
ছবি না তোলার কারণে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। আর এনআইডি না থাকায় বিভিন্ন সরকারি ও নাগরিক সেবা গ্রহণে তিনি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।
তাই ছবি ছাড়াই বিকল্প পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করে এনআইডি দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
কিন্তু ওই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় একই বছর হাইকোর্টে রিট করেন সুমাইয়া। রিটে তাঁর স্বামী মুহম্মদ আরিফুর রহমানকে আইনগতভাবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কর্তৃত্ব দেওয়া হয়।
কী চেয়েছিলেন রিটকারী
রিটের শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৬ মার্চ হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সেখানে ছবি ছাড়া বিকল্প পরিচয় এবং বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
চার বছর পর সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বুধবার তা খারিজ করে দিলেন হাইকোর্ট।
এর ফলে রিটকারীর চাওয়া বিকল্প পদ্ধতিতে ছবি ছাড়া এনআইডি দেওয়ার কোনো নির্দেশনা আদালত থেকে পাওয়া গেল না।
রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি ছিল শুরু থেকেই
রুল জারির সময় রাষ্ট্রপক্ষ এই আবেদনকে সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আপত্তি জানিয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু একটি বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য যথেষ্ট নয়। বাস্তব জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ছবির প্রয়োজন হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছিল, হজ পালনের ক্ষেত্রেও ছবি প্রয়োজন হয়। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও ছবি দিতে হয়। ছবি ছাড়া পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হলে অন্য কেউ ওই ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ বা সেবা গ্রহণ করলে দায় নির্ধারণের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া বায়োমেট্রিক পরিচয় শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে চোখের আইরিশের তথ্য নেওয়ার প্রয়োজন হলে পর্দা পালনের বিষয়টিও কীভাবে সমাধান করা হবে—রাষ্ট্রপক্ষ সেই প্রশ্নও তুলেছিল।
ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন বনাম রাষ্ট্রীয় পরিচয়ব্যবস্থা
রিটটি ঘিরে মূল আইনি প্রশ্ন ছিল—একজন নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত পর্দা পালনের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে।
হাইকোর্টের বুধবারের রায়ের ফলে অন্তত এই মামলায় ছবি ছাড়া এনআইডির দাবিটি গ্রহণযোগ্যতা পেল না।
তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর আদালত কোন সাংবিধানিক ও আইনগত যুক্তিতে রুলটি খারিজ করেছেন, তা আরও স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অধিকারের সঙ্গে এনআইডি ব্যবস্থার সম্পর্ক—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী শেখ ওমর শরীফ ও ইলিয়াছ আলী মন্ডল। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী।

