দেশের অন্যতম পুরনো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘোড়াশাল দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল থাকলেও এর পেছনে বিপুল জনবল ও ব্যয়ের বোঝা টানতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। এতে সংস্থার সার্বিক উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ক্রমাগত, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় প্রায় দুইশ দশ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার তিনশ পনেরো মেগাওয়াট, যেখানে সাতটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ সংকট, যান্ত্রিক দুর্বলতা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে কেন্দ্রটি প্রায় সারা বছরই বসে থাকছে। জ্বালানি সরবরাহ সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য বলছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কেন্দ্রের একটি ইউনিটও উৎপাদনে সক্রিয় ছিল না। এর মূল কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিকেই দায়ী করা হয়েছে।
উৎপাদন না থাকলেও কেন্দ্রটি পরিচালনার নামে বিপিডিবির নিজস্ব জনবলই রয়েছে সাড়ে সাতশর কাছাকাছি। এর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কর্মী, বিভিন্ন সাইটে নিযুক্ত লোকবল এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের যুক্ত করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজারে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিপুল কর্মীবাহিনীর বেতন-ভাতার বড় অংশই বহন করতে হচ্ছে আর্থিকভাবে সংকটে থাকা সংস্থাটিকে।
তুলনামূলক চিত্র বলছে, বেসরকারি খাতে প্রায় সমান সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে সাধারণত তিনশর মতো কর্মী প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে দুইশ জন সরাসরি কেন্দ্র পরিচালনায় যুক্ত থাকেন, বাকিরা নিরাপত্তা বিভাগে। সে হিসাবে ঘোড়াশালে কর্মরত জনবল প্রয়োজনের তুলনায় আট গুণের বেশি বলেই মনে করছেন এই খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা।
আর্থিক হিসাবেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিডিবির নিজস্ব কেন্দ্রগুলোয় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল সাড়ে আট টাকার কিছু বেশি। পরের অর্থবছরে এসে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে নয় টাকার কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অলস বসে থাকা কেন্দ্র ও তার সঙ্গে যুক্ত বিপুল কর্মীবাহিনীই এই ব্যয়বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
সংস্থার সামগ্রিক চিত্রেও দুর্বলতা স্পষ্ট। বিপিডিবির নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট হলেও গত অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুতের মাত্র তেরো শতাংশ উৎপাদন করেছে সংস্থাটি। এত কম উৎপাদনের বিপরীতে বিপুল জনবলকে বেতন দিয়ে বসিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। তাদের মত, আর্থিকভাবে দুর্বল এই প্রতিষ্ঠানের উচিত কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জনবল পুনর্বিন্যাস করা এবং বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হওয়ার মতো দক্ষতা অর্জন করা।
ইউনিটভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘোড়াশালের প্রথম দুটি ইউনিট—যাদের সম্মিলিত সক্ষমতা একশ দশ মেগাওয়াটের মতো—ইতিমধ্যে চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আড়াইশ ষাট মেগাওয়াট সক্ষমতার তৃতীয় ইউনিটটি এখন সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে রয়েছে, যার জন্য চীনের একটি ব্যাংক থেকে প্রায় সাতানব্বই মিলিয়ন ডলারের ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দিয়েছে বিপিডিবি। এই ঋণের মাধ্যমে ইউনিটটির সক্ষমতা দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়িয়ে চারশ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ ইউনিটেও (দুইশ দশ মেগাওয়াট) চলছে একই রকম সংস্কারকাজ। পঞ্চম ইউনিট মাঝেমধ্যে গ্যাস পেলে সীমিত পরিসরে চালু হয়, ষষ্ঠ ইউনিট সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, আর সপ্তম ইউনিটটি সবশেষ কয়েক মাস আগে সাময়িকভাবে গ্যাস পাওয়ায় চালানো হয়েছিল।
বিপিডিবির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে তৃতীয় ইউনিট থেকে কোনো বিদ্যুৎই উৎপাদিত হয়নি, কারণ সেটি তখন সংস্কারের মধ্যে ছিল। চতুর্থ ইউনিট থেকে এসেছে মাত্র একশ ছেষট্টি মেগাওয়াট, পঞ্চম ইউনিট থেকে কেবল তেরো মেগাওয়াট এবং সপ্তম ইউনিট থেকে আটাত্তর মেগাওয়াট। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটের এই বিশাল কেন্দ্র থেকে বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে নামমাত্র।
কেন্দ্রটির দীর্ঘদিনের এক সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, যিনি ছাব্বিশ বছর এখানে কর্মরত ছিলেন এবং ২০১৮ সালে অবসরে যান, জানিয়েছেন—গ্যাসের অভাব, উৎপাদন দক্ষতার ঘাটতি এবং নানা সময়ে চলা সংস্কার কার্যক্রম মিলিয়ে কেন্দ্রটি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে সরাসরি কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। কর্তব্যরত প্রকৌশলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। তবে আশপাশের বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছেন, কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনে নেই। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্র চত্বরে রয়েছে অতিথিশালা, স্কুল, মসজিদ, মন্দির ও মাদ্রাসার মতো বিভিন্ন স্থাপনা—ভেতরে মানুষের চলাফেরা থাকলেও উৎপাদন ইউনিটগুলোর নীরবতা দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
১৯৬৭ সালে নির্মিত এই কেন্দ্রটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগতভাবে যথেষ্ট উন্নত হতে পারেনি, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট।
এ বিষয়ে একজন শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মন্তব্য করেছেন, এত পুরনো একটি কেন্দ্রে বিপুল জনবল অলস বসে থাকলে বিপিডিবির উচিত নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখে বিদ্যমান কর্মীদের অন্য কেন্দ্রে স্থানান্তরের সুযোগ খতিয়ে দেখা। তার মতে, বেসরকারি খাতের সমমানের কেন্দ্রগুলোর জনবল কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা সম্ভব প্রকৃতপক্ষে কত কর্মী প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত নিয়োগের পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বিপিডিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু কর্মীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। তবে কেন্দ্রের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সম্পূর্ণভাবে জনবল প্রত্যাহারের সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংস্থার চেয়ারম্যান পদে থাকা একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ঘোড়াশাল বন্ধ থাকার প্রধান কারণ পাশের সার কারখানা—যেখানে গ্যাস সরবরাহ করা হলে বিদ্যমান পাইপলাইনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো সম্ভব হয় না। এই সমস্যা সমাধানে মনোহরদী থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত একটি আলাদা পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে পাইপলাইনটি প্রস্তুত হতে আরও এক বছরের বেশি সময় লেগে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে ঘোড়াশালের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় সমস্যার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে—যেখানে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং জনবল ব্যবস্থাপনার ঘাটতি একসঙ্গে মিলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে এই বোঝা সামনের বছরগুলোতেও ভর্তুকির আকারে জনগণের ঘাড়েই চেপে বসতে থাকবে।

