সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাভুক্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। অথচ এই পদটির নিয়োগ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই পিএসসির মাধ্যমে চলমান, লিখিত পরীক্ষা শেষ, ফল প্রকাশিত হয়েছে, এখন শুধু মৌখিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত নিয়োগের ধাপ বাকি। এমন পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চলমান কাজে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নিয়ে জনপ্রশাসন মহলেই প্রশ্ন উঠেছে।
গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো. হুমায়ুন কবিরের সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। সদস্যরা হলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব। কমিটির কার্যপরিধিতে শুধু বলা হয়েছে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে কমিটি। কিন্তু কীভাবে এই গতি আনা হবে, পিএসসির কোন পর্যায়ে কমিটি কাজ করবে কিংবা কমিশনের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমিটির ভূমিকা কী, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
এদিকে এই পদে লিখিত পরীক্ষার ফল ইতিমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর পিএসসির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১০ম গ্রেডভুক্ত ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা/সমমান’ পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় ৪৩০ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোট পদ ১৪ হাজার ১০০টি, যার মধ্যে তিন হাজার ৭৫১টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য পিএসসিতে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা শেষে এখন মৌখিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত নিয়োগের ধাপ সামনে। প্রশ্ন হলো, এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আলাদা প্রশাসনিক কমিটি কেন প্রয়োজন?
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়ার মতে, পিএসসির সুপারিশ ছাড়া নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে আপাতত দুটি পথ খোলা রয়েছে, একটি হলো বিধিমালা সংশোধন করে পদগুলোকে পিএসসির আওতার বাইরে নেওয়া, অন্যটি অ্যাডহক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। দুটি প্রক্রিয়াতেই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিপরিষদের সাবেক এক সচিব বলেন, “কার্যপরিধি স্পষ্ট না হওয়ায় কমিটির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা বোঝা যাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ। উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত এভাবে কমিটি করা হয় না। মন্ত্রিপরিষদের সচিবকে কমিটির সদস্য করার নজির বাংলাদেশেও খুব বেশি নেই। এদিকে এই পদে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাউকে না রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও কম নয়। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, “নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার নামে বিএনপি সরকার আরেকটি বাজে কাজ করতে যাচ্ছে। ১০ম গ্রেডের নিয়োগ পিএসসির কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেদের কমিটি গঠন করে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।” তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, “পিএসসি কী পারছে না? পিএসসি কী কোথায় বলেছে, আমরা পারছি না?” পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদও দাবি করেছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিএনপি সরকার “নির্লজ্জ দলীয়করণের” আরেকটি ফন্দি করছে।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী গত বুধবার রাতে সমকালকে বলেছেন, “এ বিষয়ে আমি এখনও কোনো চিঠি পাইনি। আগামীকাল অফিসে গিয়ে দেখে বলতে পারব।” তিনি আরও বলেন, “উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের। এখানে জনপ্রশাসনের কাজ নেই।” অথচ কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সদস্য করা হয়েছে, আর আহ্বায়ক করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, “কমিটি গঠনের বিষয়ে মন্তব্য করা আমার পক্ষে সমীচীন হবে না। তবে শূন্য পদ পূরণের জন্য পিএসসিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছে।”
এই ঘটনার প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। এর আগে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এতে নিয়োগে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও অনিয়মের আশঙ্কা করে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা, প্রসঙ্গ উঠেছে সংসদেও। এর মধ্যেই এল পিএসসির চলমান নিয়োগে প্রশাসনিক কমিটি গঠনের ঘটনা। পিএসসি নিজেও সম্প্রতি আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অধ্যাদেশের খসড়া পাঠিয়েছে। আর সেই মন্ত্রণালয়েরই প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে পিএসসির আওতাভুক্ত একটি নিয়োগে কমিটি গঠন, এই সমীকরণই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

