চট্টগ্রাম নগরীর নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ও পানি সংকটপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী খাবার পানি নিশ্চিত করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। পাইলট প্রকল্পের আওতায় নগরীতে ১০০টি ‘পানির এটিএম বুথ’ স্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের সঙ্গে তিন বছর মেয়াদি একটি অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ড কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ওয়াসার পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম এবং ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পক্ষে কান্ট্রি ডিরেক্টর আজমান আহমেদ চৌধুরী চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির আওতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো, বুথ স্থাপনের জন্য জমি বা স্থান সরবরাহ করবে চট্টগ্রাম ওয়াসা, আর বুথের সমস্ত মূলধনি যন্ত্রপাতির সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। পানির গুণগত মান যাচাইয়ের দায়িত্বও ওয়াটারএইডের। তারা ওয়াসার পাম্প বা সরবরাহ লাইনের পানির গুণগত মান মূল্যায়ন করবে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পানি শোধন ব্যবস্থা যুক্ত করবে। বুথে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা সমাধানের নিশ্চয়তা দিয়েছে ওয়াটারএইড। আর কোনো বুথ ৭২ ঘণ্টার বেশি বন্ধ থাকলে জনভোগান্তি কমাতে বিকল্প উপায়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশ্ন হলো, এই ‘পানির এটিএম বুথ’ আসলে কী? ব্যাংকের এটিএম মেশিন থেকে টাকা বের করার মতোই, এই বুথ থেকে প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা যায়। ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েলের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) অধীনে রাজধানীজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৩৫৬টি ওয়াটার এটিএম বুথ চালু রয়েছে, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা প্রতি লিটার মাত্র ১ টাকায় পরিশোধিত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বাজারের বোতলজাত পানির মূল্যের তুলনায় প্রায় ২৫ ভাগের এক ভাগ। এখন পর্যন্ত এসব বুথ থেকে ২৪০ কোটি লিটারের বেশি নিরাপদ পানি বিতরণ করা হয়েছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামেও একই মডেল চালু হতে যাচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন জনবহুল ও বস্তি এলাকায় এসব বুথ স্থাপন করা হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী খাবার পানির প্রয়োজন রয়েছে, এমন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেছেন, ‘পানির এটিএম বুথ শুধু পানি সরবরাহের একটি ব্যবস্থা নয়, মানুষের প্রয়োজনের জায়গায় নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর উদ্যোগ’। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন এবং লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্রযুক্তিতে পানি সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হবে। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আজমান আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম ওয়াসার সঙ্গে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে এবং এর সুফল সরাসরি চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
তবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়, এর সফল বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রামে এর আগে দুটি ওয়াটার বুথ চালু হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো বেশিদিন টেকেনি। তাই এই প্রকল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত কর্মী বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছাড়া বুথ থেকে সরাসরি খুচরা পানি বিক্রি বা বিতরণ করা যাবে না। এই শর্তগুলো ঠিকমতো পালিত হলে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক থাকলে চট্টগ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পানির তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব হবে। ঢাকার অভিজ্ঞতা যেমন দেখিয়েছে; সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে পানির এটিএম বুথ সাধারণ মানুষের জন্য একেবারে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে।

