আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচিতে থাকা দেশগুলোকে গত এক দশকের তুলনায় আরও বেশি সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। সংস্থাটির মতে, অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অক্সফাম জানায়, সরকারি ব্যয় সংকোচনের চাপ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান ঋণ কর্মসূচিগুলোতে সামাজিক খাতের সুরক্ষাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যম বার্ষিক মাত্রা ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আগের সময়ের তুলনায় এই চাপ চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আবারও ১৯৮০-এর দশকের কঠোর কাঠামোগত সমন্বয় নীতির মতো পথে ফিরছে কি না। ওই সময়ে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শুরুতেই বড় ধরনের সরকারি ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ নিতে হতো।
অক্সফামের আন্তর্জাতিক জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা নাবিল আবদো এমন নীতির সমালোচনা করে বলেন, কোনো দেশের ওপর শুরুতেই বড় মাত্রায় ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি করা অনেকটা একসঙ্গে পুরো বোতল বিষ পান করতে বাধ্য করার মতো।
তবে অক্সফামের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। সংস্থাটির মুখপাত্র জুলি কোজাক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিটি ঋণ কর্মসূচিতেই সামাজিক ব্যয়ের জন্য একটি ন্যূনতম সীমা রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যয় নিশ্চিত করা।
তিনি আরও জানান, শুধু সরকারি ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে না। বরং ঋণগ্রহীতা দেশগুলো কীভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর ও অন্যান্য রাজস্ব বাড়াতে পারে, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কাজ করছে।
এই বিতর্ক বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দেশে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকির ব্যবস্থাপনা সংস্কার এবং সরকারি ব্যয় আরও কার্যকর করার বিভিন্ন উদ্যোগ চলছে।
সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অপ্রয়োজনীয় মূলধনি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
চলতি বছর বাংলাদেশের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদের মধ্যে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতের প্রয়োজনীয় ব্যয় ধরে রাখা। ফলে ঋণ ও সংস্কারের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সরকারি ব্যয় কতটা কমানো হবে এবং এর প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা ও জীবনযাত্রার ওপর না পড়ে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

