জাতীয় সংসদে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন হ্যাক করে জরুরি ভিত্তিতে টাকা চাওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে কণ্ঠস্বর নকল (ভয়েস ক্লোন) করা এবং স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সরকারি ও বিরোধী, দুই দলের একাধিক সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে এই সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
চিফ হুইপ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, গত বুধবার তিনজন সংসদ সদস্য তাকে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে ৫০ হাজার, ৩০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর অনুরোধ করেন। পরে জানা যায়, ওই তিন সংসদ সদস্যের মোবাইল নম্বর হ্যাক করা হয়েছিল। চিফ হুইপ বলেন, ‘যাদের নম্বর থেকে এসেছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, কল করেছিলাম কিন্তু ধরেনি। মানে মোবাইল হ্যাক হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, শুধু ফোন হ্যাক করাই নয়, এআই প্রযুক্তি দিয়ে কারও কণ্ঠস্বর নকল করে তার পরিচয়ে টাকা চাওয়া এবং স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র তৈরি করার ঘটনাও ঘটছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে ফেস রিডিং ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চিফ হুইপ জানান, সংসদ ভবনের প্রতিটি লবিতে ফেস রিডিং ডিভাইস থাকলেও অনেক সংসদ সদস্য তা এড়িয়ে যান। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে তিনি সব সংসদ সদস্যকে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ফেস রিডিং করার অনুরোধ জানান।
এদিকে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধের দায়িত্ব কার, ব্যক্তির নাকি রাষ্ট্রের? তিনি বলেন, ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের, নির্বাহী বিভাগ বা রাষ্ট্রের।’ জবাবে চিফ হুইপ জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কাজ শুরু করেছে এবং প্রতিরোধমূলক আইনি ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম চলছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যদের ফোন হ্যাক, ভয়েস ক্লোন এবং জাল স্বাক্ষর ও নথি তৈরির মতো ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যা সমাধানে যত ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, বিটিআরসি সেগুলো নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আসলে এই ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার অপরাধীরা এখন আর সাধারণ মানুষকে নয়, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের ফোন হ্যাক করে টাকা চাওয়া, ভয়েস ক্লোন করে পরিচয় জাল করা, এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে সাইবার অপরাধীরা প্রযুক্তির ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছে। ভয়েস ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ সেকেন্ডের কণ্ঠের নমুনা থেকেই এআই টুলের মাধ্যমে নিখুঁত জাল কণ্ঠস্বর তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই ধরনের অপরাধ ঠেকাতে আইন ও প্রযুক্তি কতটা প্রস্তুত? বিটিআরসি কাজ শুরু করলেও এই লড়াই কতটা কঠিন হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিটিআরসি বা পুলিশের একার পক্ষে এই ধরনের অত্যাধুনিক সাইবার অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, দক্ষ সাইবার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি। একইসঙ্গে সংসদ সদস্যদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এই ঘটনা শুধু সংসদের নিরাপত্তা প্রশ্নই তোলে না, বরং পুরো দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও তুলে ধরে।

