দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটাতে বড় পরিসরে চিকিৎসক নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের ভিত্তিতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে মোট পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সরকারি কর্ম কমিশন। একই সময়ে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব বুঝে নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করেছেন, যা এই উদ্যোগে বাড়তি গতি যোগ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত পাঁচ হাজার পদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ চার হাজার সাতশ পদ থাকবে সহকারী সার্জন ও মেডিক্যাল অফিসার পর্যায়ে। বাকি তিনশ পদে নিয়োগ পাবেন ডেন্টাল সার্জনরা। মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে কমিশনকে আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে এই চাহিদা জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মকানুন মেনে যত দ্রুত সম্ভব এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার প্রস্তুতি চলছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত যে বিশেষ বিসিএস পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাতে দীর্ঘ ও জটিল লিখিত পরীক্ষার ধাপ থাকে না। শুধু প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন হয়। ফলে সাধারণ বিসিএসের তুলনায় এই প্রক্রিয়ায় ফল প্রকাশ ও নিয়োগ সম্পন্ন হতে সময় লাগে অনেক কম, যা জরুরি জনবল সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংসদে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রায় একচল্লিশ হাজার আটশ ছয়টি। অথচ বাস্তবে কর্মরত আছেন মাত্র ত্রিশ হাজার তিনশ এগারো জন চিকিৎসক। অর্থাৎ শূন্য পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এগারো হাজার চারশ পঁচানব্বইয়ে, যা মোট অনুমোদিত পদের প্রায় সাতাশ শতাংশ।
বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই সংকট শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং কাঠামোগতও বটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে প্রয়োজন প্রায় নব্বই হাজারের কাছাকাছি চিকিৎসক। বর্তমান জনবলের সঙ্গে সেই চাহিদার ব্যবধান বিশাল, যা মূলত গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসক না থাকার কারণে রোগীদের প্রায়ই জেলা বা বিভাগীয় শহরে ছুটতে হয়, যা চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে পাঁচ হাজার পদে নিয়োগ হলেও তা মোট শূন্য পদের অর্ধেকের কিছু বেশি পূরণ করবে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, একবারের নিয়োগেই সংকট পুরোপুরি নিরসন হবে না; বরং ধারাবাহিকভাবে একাধিক ধাপে নিয়োগ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হবে। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে একটি বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে তিন হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই অংশ বলে ধরে নেওয়া যায়।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকার সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রেখেছে, যার পরিমাণ প্রায় ঊনসত্তর হাজার চারশ নয় কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এটিই স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় সোয়া এক শতাংশের সমান। বাজেট উপস্থাপনার সময় অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, চিকিৎসাসেবাকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াই এই বাড়তি বরাদ্দের মূল লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের ধারণা, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের এই উদ্যোগ মূলত সেই নীতিগত অঙ্গীকারেরই বাস্তব প্রতিফলন।
তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই যে সমস্যার সমাধান হবে না, তা মানছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকদের ধরে রাখার মতো সুযোগ-সুবিধা, বাসস্থান ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে দেখা গেছে, নিয়োগের পরও অনেক চিকিৎসক প্রত্যন্ত এলাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকতে আগ্রহী হন না, ফলে শূন্যপদের সংকট বারবার ফিরে আসে।
এদিকে সরকারি কর্ম কমিশনের সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সপ্তাহ খানেক আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটি কক্ষে শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কমিশনের নতুন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া। দায়িত্ব নেওয়ার পর গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পাওয়াকে তিনি বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন এবং স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে তা পালনের অঙ্গীকার করেছেন।
নতুন নেতৃত্বের অধীনে বড় পরিসরের এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে আসন্ন মাসগুলোতে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা উন্নত হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, শিগগিরই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে প্রার্থীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন এবং প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই সম্পন্ন হবে।

