রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা আবারও বেড়ে যাওয়ায় কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট তৃতীয়বারের মতো খুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে প্রতিটি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে খুলে পানি নিষ্কাশন শুরু করা হয়। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তথ্যমতে, গেট খোলার সময় হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল ১০৫ দশমিক ৫১ ফুট এমএসএল (মিন সি লেভেল), যা সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুটের বেশ কাছাকাছি। এতে করে হ্রদের পানির চাপ কমিয়ে বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, হ্রদের পানির উচ্চতা ১০৫ ফুটে নেমে এলে জলকপাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হ্রদের পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে রাঙ্গামাটি জেলার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে, পানি ঢুকেছে বাঘাইছড়ি পৌরসভার বটতলী, এফ ব্লক, পুরাতন মারিশ্যা, মাস্টারপাড়া, মাদ্রাসাপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায়।
পানি বাড়ার কারণে রাঙ্গামাটি শহরের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুর পাটাতনে পানি উঠে গেছে, পর্যটকদের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে গত ২৯ আগস্ট হ্রদের পানির উচ্চতা ১০৬ দশমিক ০১ ফুটে পৌঁছালে স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ছয় ইঞ্চি করে খুলে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী গেটগুলো পর্যায়ক্রমে তিন ফুট পর্যন্ত খোলা হয়, যার ফলে প্রায় ৫৮ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হয়। পানি কমে যাওয়ায় ৬ সেপ্টেম্বর রাতে গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও পানি বেড়ে যাওয়ায় জলকপাট খুলতে হলো। বর্তমানে গেটগুলো দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৩২ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।
কাপ্তাই বাঁধ বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত। এই কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট থেকে বর্তমানে ২২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত এই বাঁধটি একদিকে যেমন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে এর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। হ্রদের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট, তবে ১০৮ ফুট হলেই বিপৎসীমা হিসেবে ধরা হয়। তাই প্রশাসন আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন করছে, যাতে ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানি ছাড়ার কারণে কর্ণফুলী নদীর ভাটির এলাকায় পানির প্রবাহ বেড়েছে, যা চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান বলেন, ‘কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’ হ্রদের পানি আরও বাড়লে কাপ্তাই বাঁধের আরও গেট খোলার প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আপাতত ১০৫ ফুটে পানি নামলেই গেট বন্ধ হবে, তবে বৃষ্টি না থামলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

