ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরির প্রবণতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার। রাজধানীতে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন মত ও পথ থাকা স্বাভাবিক হলেও যারা মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার চেষ্টা করে, তাদের সেই প্রচেষ্টার সঙ্গী হওয়া উচিত নয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে কবীর ও লালনের ভাবসংগীত নিয়ে আয়োজিত একটি উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। বক্তব্যে তিনি সাম্প্রতিক অতীতের একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভাইরাস আক্রমণের ক্ষেত্রে কারও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি—মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল কেবল মানুষ হওয়ার কারণেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে যখন টিকা তৈরি ও বিতরণ শুরু হয়, তখনো নির্দিষ্ট কোনো ধর্মাবলম্বীর জন্য আলাদা টিকা তৈরি হয়নি, বরং তা তৈরি হয়েছিল সামগ্রিকভাবে মানুষের জন্য।
আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি একটি দার্শনিক প্রশ্ন তোলেন—মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে কি তার ধর্মীয় পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব? তাঁর মতে, এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নেই, এমনকি যারা সমাজে বিভাজনের রাজনীতি করেন তাঁদের কাছেও নয়। তিনি স্পষ্ট মন্তব্য করেন, মূলত যারা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন, তাঁরাই মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা রাখেন।
বক্তব্যে ভারতীয় সাধক কবি কবীর এবং বাংলার সাধক কবি লালনের জীবনদর্শন তুলে ধরে হাইকমিশনার বলেন, পৃথিবীর কোনো ধর্মেই মানুষে মানুষে বিভাজনের শিক্ষা নেই। তবে যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, শান্তির পথ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর এই লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর ও আলোচিত বিষয়। সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত কবীর ও লালনের মতো সাধকদের অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে সামনে রেখে দেওয়া এই ধরনের বক্তব্য মূলত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজনের প্রকৃত কারণ ও সমাধান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্ক সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান, যা নিছক আহ্বান বা বক্তব্যের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরসন হওয়া একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া বলেই মনে করেন সমাজবিশ্লেষকরা।

