প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার ঠিক পরদিনই ভারতের একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে কূটনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দুটি ঘটনার সময়গত এই নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দিলেও এখন পর্যন্ত এর পেছনে সরাসরি কোনো কার্যকারণ সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে যাচ্ছেন না। এর ঠিক পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত একটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনের একটি বিশেষ অধিবেশনেও তিনি অংশ নিচ্ছেন না বলে জানানো হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, আমন্ত্রণটি মূলত আঞ্চলিক আরেকটি জোটের বর্তমান সভাপতি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন বলেও বারবার জানিয়ে আসছে ঢাকা।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ষোলোশ মেগাওয়াট, যার একটি আটশ মেগাওয়াটের ইউনিট সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কেন্দ্রটির সামগ্রিক উৎপাদন সাড়ে সাতশ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি মাসের শুরু থেকেই রেলপথে জট ও কয়লা পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল। এরপর সাম্প্রতিক সময়ে বয়লার সংক্রান্ত একটি সমস্যার কারণে একটি ইউনিট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক দিন সময় নিতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিটি প্রায় এক দশক আগে সম্পাদিত হয়েছিল এবং এটি বর্তমান সরকারের করা কোনো নতুন চুক্তি নয়, বরং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সম্পাদিত দীর্ঘমেয়াদি একটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। এই চুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা রয়েছে। কিছু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চুক্তিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শর্ত থাকলে তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে একেবারে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও জনসংযোগের গভীর সম্পর্ক বজায় থাকলেও ঢাকা এখন নিজের সার্বভৌম অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করতে চাইছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক একজন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে যাওয়া উচিত নয়। দুই বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণেই একটি বিষয়ে মিল লক্ষ করা যায়—দুই দেশের সম্পর্ক এখন পুরোনো কাঠামোয় নেই এবং নতুন বাস্তবতায় উভয় পক্ষকেই সম্পর্কের ভিত্তি নতুন করে নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে একটি একক আন্তঃদেশীয় কেন্দ্রের ওপর বড় পরিমাণ নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইতিপূর্বে মন্তব্য করেছিলেন, সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে গুরুতর অসামঞ্জস্য থাকলে তা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। যেমন—কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর মেরামত প্রক্রিয়া ঠিক কত দ্রুত শুরু হয়েছে, কয়লা সরবরাহের সংকট কেন এত দীর্ঘস্থায়ী হলো, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট দায় কী, এবং সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কোনো ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রাখে কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা তথ্যভিত্তিক হলেও এগুলো পরস্পরের কারণেই ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো নেই। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত প্রযুক্তিগত অবস্থা, চুক্তির শর্তাবলি এবং উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করাই যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি এই সংকটকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের অতিরঞ্জন বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়াচ্ছে কি না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এই ঘটনা মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে এনেছে—একদিকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক জ্বালানি চুক্তিতে সরবরাহ নিশ্চয়তার প্রশ্ন, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে অর্থনৈতিক নির্ভরতার জটিল সম্পর্ক। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরি এবং বিদ্যমান চুক্তিগুলোর শর্ত পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

