২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ৩৯টি হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে এই ধারণা থেকে যে, কেবল ভৌত অবকাঠামো তৈরি করলেই প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান হবে এবং দেশে প্রযুক্তি ব্যবসার জোয়ার উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার’ (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনায় শিল্প নেতা ও সাবেক নীতিনির্ধারকরা এই ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেন, তাঁরা অভিযোগ করেন, অপর্যাপ্ত ইকোসিস্টেম সহায়তা, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, দুর্বল শিল্প-শিক্ষা সংযোগ, অবহেলিত রক্ষণাবেক্ষণ, উচ্চ ইউটিলিটি খরচ এবং অবস্থানের কারণে এসব পার্ক প্রত্যাশিত সাফল্য আনতে পারেনি।
উত্তর সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম রোকনুজ্জামান এই আলোচনায় বলেন, ‘শুধু ভৌত অবকাঠামো তৈরি করলেই প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আসবে; এই ধারণা থেকে ৩৯টি পার্ক বানানো হয়েছে। কিন্তু ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, ধারণাটি সঠিক ছিল না।’ তিনি তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম অবকাঠামোর সঙ্গে সমান্তরালভাবে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়, সঙ্গে দরকার ছিল দক্ষ জনবল, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং প্রযুক্তি-বান্ধব নীতিসহায়তা।
যশোর হাই-টেক পার্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে অংসোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোহিদুল ইসলাম বলেন, পার্কটিতে বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের মধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান কোনো রকমে টিকে আছে। তাঁর অভিযোগ, ‘কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে নয়, বরং ভাড়াটিয়া হিসেবে দেখে।’ প্রশিক্ষিত জনবল দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায়, অবকাঠামোর দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ও উচ্চ ইউটিলিটি খরচ ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে রাজশাহী হাই-টেক পার্ক কিছুটা ইতিবাচক চিত্র দেখিয়েছে। নেট্রো সিস্টেমস ও টেলজেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মো. আসাফুদ্দোজা শিশির জানান, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ইনকিউবেশন সেন্টার থেকে বেশ কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উঠে এসেছে এবং পরে সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে। তবে প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা সীমিতই রয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘রাজশাহী হাই-টেক পার্কে কোম্পানিগুলোর জন্য প্রকৃত সুবিধা কেবল কর অব্যাহতিতে সীমাবদ্ধ। স্টার্টআপদের জন্য সরাসরি কর্তৃপক্ষের সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত।’
ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও সিইও ফারহানা এ রহমান বলেন, সমস্যাটি শুধু কোনো একটি পার্কের নয়। ‘আমরা হাই-টেক পার্ক নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফাঁদে আটকে আছি। দেশজুড়ে এত পার্ক বানানো হয়েছে, তবুও মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত অগ্রগতি নেই।’ কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোকে পর্যাপ্ত সহায়ক সেবা ছাড়াই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ফলে অনেকেই প্লট ছেড়ে দিয়েছে। ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাফেল কবিরের পরামর্শ, সরকারের উচিত শুধু রপ্তানি কর প্রণোদনার গণ্ডি ছাড়িয়ে পার্কগুলোর ব্রোডার উদ্দেশ্য পুনর্বিবেচনা করা। তাঁর মতে, মাদারবোর্ড ও চিপের মতো ভিত্তি প্রযুক্তি উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং ইপিজেডের মতো পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নিশ্চিত করা উচিত।
অবস্থানের ভুলও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের হাই-টেক পার্কের মূল ব্যর্থতার কারণ হলো এমন অঞ্চলে ভারী ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা, যেখানে স্থানীয় অর্থনীতি কার্যকর নয়।’ তাঁর পরামর্শ, এই পার্কগুলোকে বিদ্যমান ইপিজেড, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক হাবের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত, যেখানে ব্যবসাগুলো বাজার, প্রতিভা ও সহায়ক সেবা খুঁজে পাবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘কালিয়াকৈরে না গিয়ে অনেকেই নিজস্ব সীমানায় পার্ক ঘোষণা করে করসুবিধা নিয়েছেন। বাস্তবে মেঘনা ছাড়া আর নয়টি বেসরকারি পার্কই ব্যর্থ।’ স্টার্টআপ তহবিলের অপচয়ের প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগে মন্ত্রী বা শীর্ষ কর্তাদের ব্যক্তিগত পছন্দে সরকারি ফান্ড বিতরণ করা হতো। ফলে অর্থায়ন পাওয়া প্রায় ৩০টি কোম্পানির মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখন বন্ধের মুখে এবং সফল মাত্র পাঁচ-সাতটি।
আলোচনার সারমর্মে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত ভৌত অবকাঠামো থেকে সরে এসে প্রযুক্তি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর দিকে মনোযোগ দেওয়া। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য ভৌত রিয়েল এস্টেট নির্মাণ থেকে সরে এসে সফট অবকাঠামো, দক্ষ মানব সম্পদ এবং শিল্পনির্ভর প্রশিক্ষণ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’ আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, হাই-টেক পার্ক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, তবে কার্যকর ইকোসিস্টেম, নির্ভরযোগ্য ইউটিলিটি, জবাবদিহিমূলক সুশাসন, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি সহায়তার ভিত্তিতে এটিকে নতুন করে সাজানো উচিত।

