পুরান ঢাকার লালবাগে ভাড়া বাসা থেকে আনোয়ার হোসেন (৪৭) নামে এক আইনজীবীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের শহীদনগরের বউবাজার ৩ নম্বর গলির একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহের অবস্থা দেখে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তাঁর মৃত্যু হয়েছে দুই থেকে তিন দিন আগে। পাশের কক্ষের এক ভাড়াটে তাঁকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দিলে লালবাগ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে।
আনোয়ার হোসেন মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নামে জজকোর্টের একজন আইনজীবী ছিলেন। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইন পেশায় নিয়মিত ছিলেন না। বউবাজার ৩ নম্বর গলির ওই ভাড়া বাসার একটি কক্ষে তিনি একাই থাকতেন। তাঁর পরিবার থাকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার গোয়ালগাঁও গ্রামে। লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জামিল হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে স্ট্রোক করে দুই দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর পরিবারের লোকজনকে খবর দেওয়া হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়, এটি ঢাকা শহরের ভাড়া বাসায় একা থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার একটি বড় চিত্র। আনোয়ার হোসেন একজন শিক্ষিত পেশাজীবী ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পেশা ছেড়ে দিয়ে একা ভাড়া বাসায় থাকতেন। কেউ তাঁর খোঁজ নিত না, এমনকি মৃত্যুর পরও দুই-তিন দিন কেউ টের পায়নি। পাশের কক্ষের ভাড়াটে দুর্গন্ধ পেয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান। এই বাস্তবতা ঢাকার ভাড়া বাসাগুলোতে বসবাসকারী হাজারো একাকী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রতিবেশী-সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এসব কারণেই আজ এমন ঘটনা ঘটছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বাহ্যিক আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ওসি মোহাম্মদ জামিল হোসেন আরও জানান, তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে সব ধরনের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করে ফেলেছে, যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইনজীবী আনোয়ার হোসেন কেন আইন পেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে, পেশাগত জীবনে ব্যর্থতা, পারিবারিক দূরত্ব কিংবা মানসিক চাপ অনেক সময় একজন মানুষের জীবনকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। ঢাকায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভাড়া বাসায় একা থাকেন, যাদের কেউ নেই—মৃত্যুর পরও খবর পায় না পরিবার। এই ঘটনার পর স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, ভাড়া বাসার মালিক ও প্রতিবেশীদের উচিত নিয়মিত খোঁজখবর রাখা। যদিও আইনত এটি বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু মানবিকভাবে এটি প্রত্যেকের দায়িত্ব।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে কোনো অপরাধের আলামত পাওয়া যায়নি। তবে রিপোর্টে ভিন্ন কিছু উঠে এলে তদন্তের গতিপথ বদলাতে পারে। আপাতত লালবাগ থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে। আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু ঢাকার একাকী জীবনযাত্রার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়ে গেল।

