দেশের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং পৃথক নির্বাচনব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে হিন্দু মহাজোট। আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক এ দাবি জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দাবি মেনে না নিলে হিন্দু সম্প্রদায় কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে।
সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের আহ্বান-
‘সংখ্যালঘু সমস্যার স্থায়ী সমাধান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ ও প্রতিনিধিত্বশীল প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংবিধান ও নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রস্তাব’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। তিনি বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষিত, উদার এবং নির্লোভ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। আমরা আশা করি, এই সরকার প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।”
গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক পৃথক নির্বাচনব্যবস্থার একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার ১২ শতাংশ সংখ্যালঘুদের জন্য ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৪২টি আসন সংরক্ষণ করা উচিত। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ৩৮টি, বৌদ্ধদের জন্য ৩টি এবং খ্রিস্টানদের জন্য ১টি আসন বরাদ্দ করার প্রস্তাব দেন। এছাড়া, ছয়টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের মধ্যে ৪টি হিন্দু এবং ২টি বৌদ্ধ নারীদের জন্য রাখা উচিত।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের অভাব তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যার অনুপাতে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। গত ৫৫ বছরে কোনো সংসদেই হিন্দু সম্প্রদায় তাদের অনুপাত অনুযায়ী প্রতিনিধি পাঠাতে পারেনি। বিএনপি থেকে সর্বোচ্চ একজন, জাতীয় পার্টি থেকে দুই থেকে তিনজন এবং আওয়ামী লীগ থেকে ছয় থেকে পনেরোজন পর্যন্ত সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য হয়েছেন।
গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক অভিযোগ করেন, “যৌথ নির্বাচনের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পৃথক নির্বাচনব্যবস্থা প্রয়োজন।”
সংখ্যালঘু ইস্যুকে দেশ-বিদেশে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতার কথাও তুলে ধরেন মহাসচিব। তিনি বলেন, “ভারত থেকে শুরু করে আমেরিকার নির্বাচনেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যু তাদের ভোট বাড়ানোর কাজে ব্যবহার হচ্ছে। অথচ স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে কেউই কিছু বলছে না। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এক ভীতিকর পরিবেশে বাস করছে।”
সংবাদ সম্মেলনে মহাজোটের সভাপতি দীনবন্ধু রায় বলেন, “সংখ্যালঘু হওয়ায় আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমরা আশা করি, সরকার এবং অন্যান্য ধর্মের লোকজন আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন জোটের নির্বাহী সভাপতি প্রদীপ কুমার পাল, সহসভাপতি দুলাল কুমার মণ্ডল। উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি তরুণ কুমার ঘোষ, যুগ্ম মহাসচিব হেমন্ত দাস, বিপুল বিশ্বাস, নকুল কুমার মণ্ডল এবং মহিলা মহাজোট, যুব মহাজোট ও ছাত্র মহাজোটের নেতারা।
হিন্দু মহাজোটের এই দাবি শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নয়। এটি সামগ্রিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করারও একটি প্রয়াস। সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সদিচ্ছাই এই সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

