সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে গ্রামবাসীর একটি পক্ষের আপত্তির মুখে বাউলগানের একটি ঘরোয়া আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে। মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে ছোট পরিসরে এই আয়োজন করেছিলেন শওকত আলী। আপত্তি ওঠার পর পুলিশ তাঁর সঙ্গে কথা বলে, এরপর তিনি অনুষ্ঠান বাতিল করেন। এর আগে একই উপজেলায় মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও বাতিল করতে হয়েছিল। পরপর দুটি ঘটনায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নারীদের খেলাধুলার পরিসর নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জানা গেছে, দিরাই থানার হাতিয়া গ্রামে আয়োজনটি হওয়ার কথা ছিল। এতে আপত্তি জানিয়ে গত বুধবার গ্রামবাসীর পক্ষে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে লিখিত আবেদন করেন আতাহার আলী ও কামরুল হাসান। আবেদনে বলা হয়, হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামি ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা ও একজন ওলির মাজার আছে। বসবাস করেন অনেক আলেম-ওলামাও। আবেদনকারীদের দাবি, নারী শিল্পীদের গানের আয়োজন চলতে থাকলে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
অভিযোগকারী কামরুল হাসান বলেন, তাঁদের গ্রামে আগে গানবাজনা হলেও এখন এ ধরনের আয়োজন হয় না। গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা আছে, প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল হয়। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজনে গ্রামবাসীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, গানের নামে অশ্লীলতা হতে পারে। তাই ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শওকত আলী জানান, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন। আপত্তি ওঠায় এবং থানা থেকে ফোন করায় সামাজিক সম্প্রীতির কথা ভেবে তিনি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, খোঁজ নিয়ে তিনি দেখেছেন এটি বাউলগানের একটি ঘরোয়া আয়োজন ছিল। আপত্তি ওঠার পর পুলিশ আয়োজকের সঙ্গে কথা বলেছে। পরে আয়োজক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি গানবাজনা করবেন না।
এর আগে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র বাধার মুখে দিরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করতে হয়। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে মেয়েদের ফুটবলে আপত্তি জানানো হয়েছিল, এখন একটি পক্ষের আপত্তিতে বাউলগান বন্ধ হলো। পরপর দুটি আয়োজন স্থানীয় আপত্তিতে বন্ধ বা স্থগিত হওয়া দুঃখজনক। তাঁর মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার দাবিই আপত্তির মূল কারণ হলেও এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবতে হবে।
ঘটনাটিতে একটি বিষয় লক্ষণীয়। বাউলগানের আয়োজনটি ছিল বাড়ির ভেতরে, পারিবারিক উপলক্ষে। আবেদনের পর পুলিশ আয়োজকের সঙ্গে কথা বলেছে এবং এরপরই তিনি অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ আয়োজক নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলা হলেও সিদ্ধান্তের পেছনে স্থানীয় চাপ ও থানার ভূমিকা ছিল। আয়োজনটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা হবে, সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। স্থানীয় আপত্তির মুখে বারবার আয়োজন বন্ধ হলে সংস্কৃতিচর্চা ও নারীদের অংশগ্রহণের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকাই বড় হয়ে উঠছে।

