বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৫টি দেশের অন্তত ৪০৭ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি আছেন। তাঁদের মধ্যে ১৭২ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা মুক্তি পাওয়ার উপযোগী হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের ছাড়পত্র ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় তাঁরা এখনো কারাগারেই দিন কাটাচ্ছেন। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার এ খবর জানিয়েছে।
কারা সূত্র জানায়, মোট ৪০৭ বন্দির মধ্যে ৪৪ জন সাজাপ্রাপ্ত, ১৯১ জন বিচারাধীন এবং ১৭২ জন দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। সাজাপ্রাপ্তদের কারও মৃত্যুদণ্ড হয়নি। বন্দিদের বেশির ভাগই ভারত ও মিয়ানমারের নাগরিক।
সবচেয়ে বেশি বন্দি ভারতীয়। দেশটির ২৩৮ জন বাংলাদেশের কারাগারে আছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬৮ জনের সাজা শেষ হলেও দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তাঁরা কারাগারেই রয়ে গেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে মিয়ানমার, যাদের ১৩৩ জন নাগরিক কারাগারে আছেন। ৪৪ জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দির মধ্যে ৩৩ জনই মিয়ানমারের। তবে তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
বাকি বন্দিদের মধ্যে ৬ জন নাইজেরিয়ার, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার ৩ জন করে, তানজানিয়া ও পেরুর ২ জন করে। এ ছাড়া জর্জিয়া, বাহামাস, বেলারুশ, গায়ানা, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও থাইল্যান্ডের একজন করে নাগরিক বন্দি আছেন। কারা সূত্র জানায়, মাদক চোরাচালান, স্বর্ণ পাচার, জালিয়াতি, নকল ডলার ব্যবসা, পাসপোর্টসংক্রান্ত অপরাধ, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা ও মানবপাচারের মতো অভিযোগে এসব বিদেশিকে আটক করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের জেলার (মিডিয়া ও লজিস্টিকস) মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে ছাড়পত্র না আসায় বন্দিরা দেশে ফিরতে পারছেন না। কারা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়ে আসছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বন্দিদের নাম, ঠিকানাসহ তথ্য ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোতে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কনস্যুলার উইংয়ের এক কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানান, সাজা শেষ হওয়া ২৫ ভারতীয় নাগরিক দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন, যাঁদের পরিচয় যাচাই হয়েছে। প্রত্যাবাসন দ্রুত করতে হাইকমিশন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্ভাব্য তারিখ আগেভাগে জানাতে অনুরোধ করেছে।
তবে জটিলতার বড় জায়গা নাগরিকত্ব যাচাই। ওই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১২১ বন্দির একটি তালিকা দিয়েছে, যাঁদের ভারতীয় নাগরিক বলা হয়েছে এবং যাঁদের সাজার মেয়াদ শেষ। কিন্তু এঁদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রে যে তথ্য আছে, তা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অনুমতি (কনস্যুলার অ্যাক্সেস) চেয়েছে হাইকমিশন। এ বিষয়ে তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তরের অপেক্ষায় আছে। কিছু বন্দির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য থাকলেও নাগরিকত্ব যাচাই ঝুলে আছে।
মিয়ানমার দূতাবাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দ্য ডেইলি স্টার ইমেইলে বারবার যোগাযোগ করলেও তারা সাড়া দেয়নি।
সাজা শেষে বিদেশি বন্দিদের আটকে রাখায় প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে এবং সরকারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কারা কর্মকর্তারা। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশি বন্দিদের আলাদা সেলে রাখা হয় এবং ওয়ার্ডের বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চলে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের একটি হোটেলে অনলাইন জালিয়াতির অভিযোগে ছয় চীনা নাগরিক গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর আগে জানুয়ারিতে একই ধরনের অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার ইউনিট পাঁচ চীনা নাগরিকসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
সব মিলিয়ে সমস্যার মূলে আছে দুই পক্ষের সমন্বয়ের ঘাটতি। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে সাড়া মিলছে না, আর ভারতীয় হাইকমিশন বলছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের তথ্য অপর্যাপ্ত। সাজা শেষ হওয়ার পরও কাউকে আটকে রাখা মানবাধিকারের প্রশ্নও তোলে। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে নাগরিকত্ব যাচাই ও ছাড়পত্রের জট খুলতে না পারলে এই বন্দিদশা দীর্ঘায়িত হবে।

