সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্षित নতুন বেতন কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তন হলো— এখন থেকে সবাই সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন না। যার বেতন গ্রেড যত উপরে, তার ইনক্রিমেন্টের হার তত কম হবে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মূল বেতন বড় অঙ্কে বাড়লেও বাড়ি ভাড়া ভাতার হার সবার জন্যই কিছুটা কমানো হচ্ছে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কাঠামো অনুমোদিত হয়েছে। সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এই তথ্যগুলো জানা গেছে।
বর্তমান নিয়মে সব গ্রেডের কর্মীরা বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় এই একক হার তুলে দিয়ে গ্রেড অনুযায়ী আলাদা আলাদা হার নির্ধারণ করা হচ্ছে। ২০তম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত হার অপরিবর্তিত থাকবে ৫ শতাংশে। এর ওপরের গ্রেডগুলোতে ধাপে ধাপে কমবে— ৫ম গ্রেডে ৪ শতাংশ, ৪র্থ ও ৩য় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২য় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সশস্ত্র বাহিনীতেও একই যুক্তিতে ক্যাপ্টেন ও তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল-কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারিত হচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হচ্ছে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা ভাতাও, যা শুরুতে ৫ শতাংশ থাকলেও পরে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আটটি পে-স্কেল বাস্তবায়ন করেছে সরকার, সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছরের ব্যবধানে। ২০১৫ সালের কাঠামো চালুর সময় বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে আর নতুন পে-কমিশনের প্রয়োজন হবে না এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ ছাড়ালে ইনক্রিমেন্ট সমন্বয় করা হবে— যদিও বাস্তবে তা কখনো কার্যকর হয়নি।
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এই হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। অন্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় হার ৪০-৫৫ শতাংশ থেকে কমে ৩০-৫০ শতাংশ হবে, আর বাকি এলাকায় ৩৫-৫০ শতাংশ থেকে কমে ২৫-৪৫ শতাংশ হবে। তবে শতাংশের হার কমলেও মূল বেতন দ্বিগুণ বা তার বেশি বাড়ায় বাড়ি ভাড়ার প্রকৃত অঙ্ক বরং বাড়বে বলে জানা যাচ্ছে।
আগে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড মিলত। নতুন নিয়মে এই মেয়াদ কমিয়ে ৮ বছর করা হয়েছে, তবে দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার জন্য আগের মতোই ৬ বছর লাগবে। পদোন্নতিযোগ্য পদে থাকা কেউ চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এই সুযোগ পাবেন, আর ব্লকড পদে থাকা কর্মীরা পাবেন তিনবার— ৮, তারপর ৬ এবং শেষে আরও ৮ বছর পর।
চিকিৎসা ভাতা বয়সভিত্তিক করা হচ্ছে। ৫০ বছর পর্যন্ত মাসে ৩,০০০ টাকা, ৫০-৬০ বছর বয়সীদের ৪,০০০ টাকা, ৬০-৭০ বছর বয়সী পেনশনভোগীদের ৫,০০০ টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে— যা আগে ছিল যথাক্রমে ১,৫০০ এবং ২,৫০০ টাকা।
প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের কর্মীরা মোবাইল ফোন ভাতা পাবেন। ১ম থেকে ৫ম গ্রেডের জন্য মাসে ৫০০ টাকা (আগে ১,০০০-১,৫০০ টাকা ছিল) এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য নতুন করে মাসে ১৫০ টাকা বরাদ্দ হবে।
যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে বেড়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে। তবে নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশ হবে। পাহাড়ি এলাকা ও হাওর-দ্বীপ-চর অঞ্চলের ভাতার হার (মূল বেতনের ২০ শতাংশ) অপরিবর্তিত থাকলেও, সর্বোচ্চ সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ৫,০০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত। ঝুঁকি ভাতাসহ বিশেষ ভাতাগুলো বিদ্যমান হারের ওপর ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ১৭টি গ্রেডে বেতন নির্ধারণ হচ্ছে। সর্বনিম্ন পদমর্যাদায় প্রারম্ভিক বেতন ২১,০০০ টাকা এবং মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় বেতন হবে ১,৫৬,০০০ টাকা। বিমানবাহিনীর উড্ডয়ন ভাতা ১০০-১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর কমান্ড, স্টাফ, প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট ভাতাগুলোতে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। প্যারাসুট, কমান্ডো ও স্কুবা ডাইভিং সংশ্লিষ্ট বিশেষ ভাতাগুলো ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে নতুন কাঠামোর গেজেট তৈরির কাজ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের জুলাই, আগামী ডিসেম্বর এবং তার পরের জুলাই— এই তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর হবে, আর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে সব ভাতা কার্যকর হবে।
এই পরিবর্তনে তিন বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা— চলতি বছরে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা, পরের বছর ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা এবং তার পরের বছর ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বেতন-ভাতা-পেনশন খাতে সরকারের মোট ব্যয় বর্তমান ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে পূর্ণ বাস্তবায়নের পর দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই কাঠামো একদিকে নিম্ন ও মধ্য গ্রেডের কর্মীদের জন্য সুবিধা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের একটি সতর্ক ভারসাম্যও তৈরি করছে। সামগ্রিকভাবে এটি রাষ্ট্রীয় বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।

