একসময় যে অঞ্চল পরিচিত ছিল ধান, নদী আর খালের সমৃদ্ধিতে, আজ সেই বরিশাল বিভাগই দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দরিদ্রতম বিভাগের তালিকায় থাকা রংপুরের জায়গা এখন নিয়েছে বরিশাল এমন তথ্যই মিলেছে সাম্প্রতিক দারিদ্র্য মানচিত্রে।
ঐতিহাসিকভাবে বরিশাল ছিল বণিকদের আনাগোনায় সমৃদ্ধ একটি জনপদ, যার প্রাচীন নাম ‘বাকলা’ অর্থাৎ শস্য ব্যবসায়ীদের এলাকা। কৃষি উৎপাদনে এই অঞ্চল একসময় পরিচিত ছিল দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে, আর নদী-খালের নেটওয়ার্কের কারণে তুলনা করা হতো ভেনিসের সঙ্গে। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ইতিহাসের পাতায়।
স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও কৃষকদের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে একাধিক কারণ। যোগাযোগ অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি অবহেলা, শিল্পায়নের অভাব, কৃষি উৎপাদনে ভাটা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট— সব মিলিয়েই বরিশাল পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, ভোলায় বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিতে তা কাজে লাগানো যায়নি। ফলে ভাগ্য বদলাতে বিভাগের বহু মানুষ পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীর দিকে।
দেশের কৃষি পরিসংখ্যান বলছে, আউশ উৎপাদনে বরিশাল এখন চতুর্থ স্থানে, আমনে পঞ্চম এবং বোরোতে সবার নিচে অষ্টম স্থানে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আউশ উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টন থেকে কমে সাড়ে তিন লাখ টনের কিছু বেশিতে নেমেছে, আমন উৎপাদনেও কমতির ধারা স্পষ্ট। কৃষি অর্থনীতির একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এই পতনের মূল কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলছেন। তার ব্যাখ্যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলীয় এই অঞ্চল সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধানের বদলে চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন।

ইলিশ উৎপাদনেও একই রকম নেতিবাচক ধারা দেখা গেছে। এক সময়ে দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের উৎস ছিল এই অঞ্চল, কিন্তু বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় সাড়ে আটাশ শতাংশ কমে গেছে। কৃষক পরিবারের আয়ের হিসাবেও বরিশাল দেশের সবচেয়ে নিচের সারিতে— শস্য উৎপাদন থেকে বার্ষিক নিট আয়ের দিক থেকে এই বিভাগ দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন, আর প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার যখন প্রায় উনিশ শতাংশ, তখন বরিশালে এই হার ছাড়িয়ে গেছে ছাব্বিশ শতাংশ। এই দারিদ্র্যই বিভাগের মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অভিবাসনের দিকে— জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী বরিশালের স্থানীয়দের প্রায় সাড়ে আঠারো শতাংশ এখন রাজধানীতে বসবাস করছেন। তবে এই অভিবাসনও তাদের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারেনি বলেই মনে হয়— ঢাকার বস্তিবাসীদের প্রায় তেরো শতাংশই বরিশাল থেকে আসা মানুষ।
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ছিল ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক পরিবারের, পাশাপাশি ঝালকাঠিতে ছিল আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার আধিপত্য। কিন্তু এই দীর্ঘ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরং এ সময়েই দারিদ্র্য আরও বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। স্থানীয় একজন সংসদ সদস্য এই প্রসঙ্গে বলেন, অতীতে দক্ষিণাঞ্চলের বড় নেতারা মূলত জাতীয় রাজনীতিতেই মনোযোগী ছিলেন, নিজ আসনের বাইরে পুরো অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন নিয়ে ভাবেননি কেউ।
শিল্প-কারখানার সংখ্যার দিক থেকেও বরিশাল বিভাগ পিছিয়ে। দেশের তেইশ জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় সাড়ে আঠাশ হাজার কারখানার মধ্যে বরিশাল বিভাগে আছে মাত্র বরিশাল নগরীতে, সংখ্যায় চারশর সামান্য বেশি— যা তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বিভাগের বাকি পাঁচ জেলায় কোনো কারখানাই নেই। বরিশালের জেলা প্রশাসক বলছেন, ধান ও মাছভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমও এখন অতীতের তুলনায় সংকুচিত, ফলে কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভোলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে একটি নতুন মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা রহমতপুর থেকে হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে ভোলা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে কাজে লাগিয়ে সেখানে একটি সার কারখানা ও পাঁচশ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় একজন প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, ভোলার গ্যাসসম্পদ ব্যবহার করে শিল্পকারখানা গড়া গেলে এবং সংযোগ সড়ক তৈরি হলে অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়বে। প্রধানমন্ত্রীর একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা মনে করছেন, ভোলার গ্যাস সঠিকভাবে ব্যবহার, পায়রা বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর এবং ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ— এই চারটি বিষয় বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, বরিশালের এই পতন কোনো একক কারণে ঘটেনি— বরং কৃষির প্রাকৃতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, অবকাঠামোগত অবহেলা এবং শিল্পায়নের অনুপস্থিতি একযোগে কাজ করেছে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পতনে। ভোলার গ্যাসের মতো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারা এই ব্যর্থতার একটি বড় দৃষ্টান্ত। সরকারের নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র বদলাতে পারে বলে আশাবাদী স্থানীয়রা, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনার বাস্তবায়নই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

